বিনিয়োগ স্থবিরতায় কর্মসংস্থানে খরা

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদহারের নীতির প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। একদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে ভালো অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলোতে দ্রুত আমানত বাড়লেও সেই অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। ফলে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বা অলস টাকার পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই অলস তহবিল বেড়েছে ৫৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। গত বছরের মার্চে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মার্চ শেষে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, কিন্তু ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৩ শতাংশে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে।

ব্যাংকারদের মতে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা প্রকাশ্যে আসায় গ্রাহকরা নিরাপদ মনে করা ব্যাংকগুলোতে অর্থ স্থানান্তর করছেন। এতে কিছু ব্যাংকে আমানতের চাপ বাড়ছে। কিন্তু ভালো ঋণগ্রহীতার অভাব ও উচ্চ সুদের কারণে সেই অর্থ বিতরণ করা যাচ্ছে না। মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুুুবুর রহমান বলেন, ‘তারল্য যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে ঋণ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ভালো গ্রাহক নির্বাচন ও ঋণ বিতরণে সময় লাগে। ফলে অতিরিক্ত অর্থ ট্রেজারি বিল-বন্ডসহ বিভিন্ন নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।’ তবে পুরো ব্যাংক খাতের চিত্র এক নয়। ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক এখনো তারল্য ঘাটতিতে রয়েছে।

বাড়ছে বেকারত্বের শঙ্কা : অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদহার প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বর্তমানে ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি নতুন শিল্প স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করছে। ফলে শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। তাদের মতে, ব্যাংকে জমে থাকা বিপুল অলস অর্থ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। এই অর্থ উৎপাদন, শিল্প ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে প্রবাহিত না হলে প্রবৃদ্ধির গতি আরও মন্থর হতে পারে।

৬১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা : এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ২০ হাজার কোটি টাকা থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে। বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমই খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উত্তরবঙ্গের কৃষি হাব গঠনের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন, যা বর্তমান বাজার সুদের প্রায় অর্ধেক। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অর্থনীতিতে বেকারত্বের চাপও বাড়তে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights