বুরকিনা ফাসোয় ফিরল মৃত্যুদণ্ড, নিষিদ্ধ সুন্দরী প্রতিযোগিতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোয় সামরিক সরকারের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় এক কঠোর ও অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। দেশটির বর্তমান সামরিক শাসক ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরের প্রশাসনের অধীনে সম্প্রতি এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা দেশটিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো দীর্ঘ সময় পর দেশটিতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান পুনরায় চালু করা এবং দেশজুড়ে সমস্ত সুন্দরী প্রতিযোগিতা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা।

সাম্প্রতিক এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে গত ২০ অক্টোবর বুরকিনা ফাসোর অন্তর্বর্তীকালীন সংসদ একটি নতুন দণ্ডবিধি সর্বসম্মতিক্রমে পাস করে। এই নতুন আইনের মাধ্যমে দেশটিতে আবারও মৃত্যুদণ্ডের বিধান ফিরিয়ে আনা হয়েছে। উপস্থিত ৭১ জন আইনপ্রণেতার সবাই এই আইনের পক্ষে ভোট দেন, যা মূলত ২০১৮ সালে নেওয়া দেশটির ঐতিহাসিক মৃত্যুদণ্ড বাতিলের সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ উল্টে দিল।

উল্লেখ্য, বুরকিনা ফাসোয় সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৮৮ সালে।

নতুন এই আইনে সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং গুপ্তচরবৃত্তির মতো অত্যন্ত গুরুতর অপরাধগুলোর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দেশটির বিচারমন্ত্রী এদাসো রদ্রিগে বায়ালা এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন যে, ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে সুদৃঢ় করার স্বার্থেই এ ধরনের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

এদিকে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সামরিক সরকার। গত ৮ জুন বুরকিনা ফাসোর যোগাযোগ, সংস্কৃতি, শিল্প ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এক ঘোষণায় দেশজুড়ে সব ধরনের সুন্দরী প্রতিযোগিতা স্থগিত করার কথা জানায়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জাতীয় ঐতিহ্য, নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব অনুষ্ঠানের নতুন নিয়মাবলি প্রণয়ন না করা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। এই স্থগিতাদেশ কার্যকর করতে সরকার বর্তমানে কোনো ধরনের সুন্দরী প্রতিযোগিতা আয়োজনের অনুমতিও দিচ্ছে না।

তবে এই সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে নারী শিক্ষার প্রসারে অন্য এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে দেশটির সরকার। গত আগস্ট মাসে তরুণ নারীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে ‘হাকিলি মুসো’ নামের একটি জাতীয় বিজ্ঞান প্রতিযোগিতার সূচনা করা হয়। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান এবং রসায়নে নারী শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় ৮৪ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। পরে রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম ত্রাওরে এই প্রতিযোগিতার বিজয়ী মেধাবী ছাত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ক্যারিয়ার গড়তে তাদের উৎসাহিত করেন।

সরকারের এসব আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপে দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মৃত্যুদণ্ড ফিরিয়ে আনার তীব্র সমালোচনা করে সতর্ক করেছে যে, এই আইন রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে অপব্যবহার করা হতে পারে এবং এর ফলে দেশটিতে বিদ্যমান নাগরিক স্বাধীনতার সংকোচন আরও বেশি তীব্র আকার ধারণ করবে। অন্যদিকে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও মৃত্যুদণ্ডের তীব্র বিরোধিতা করে একে জীবনের অধিকারের এক অপূরণীয় লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।

সুন্দরী প্রতিযোগিতা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েও সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সরকারের এই পদক্ষেপের সমর্থকরা মনে করছেন যে, এর মাধ্যমে নারীদের কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের পরিবর্তে তাদের শিক্ষাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনগুলোকে বেশি স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। তবে সমালোচকদের মতে, নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থাকা উচিত এবং তারা নিজ ইচ্ছায় কোন ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করবেন তা নির্ধারণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের থাকা আবশ্যক।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বুরকিনা ফাসো সামরিক শাসনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো দেশটির নিরাপত্তা কৌশল, সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নে সরকারের আমূল পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিরই স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights