ভয়ংকর জম্বি এখন বাংলাদেশে

ইমরান রহমান
বাংলাদেশেও চোখ রাঙাচ্ছে আমেরিকান ভয়ংকর মাদক জম্বি। সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে রাজধানী ঢাকার একটি মেট্রোরেল স্টেশন, গাজীপুরের টঙ্গী ও দিনাজপুরের হিলিতে জম্বি সেবনকারীদের অদ্ভুত আচরণের ভিডিও ভাইরাল হয়। এরপরই মাদকটি সম্পর্কে অধিকতর অনুসন্ধান শুরু করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। ইতোমধ্যে জম্বি পাচারে জড়িত একটি দেশীয় চক্রের সন্ধান পেয়েছে সংস্থাটি।

ডিএনসি সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি ভারতে জম্বি মাদকের প্রাদুর্ভাবের খবর আসা শুরু হলেও বাংলাদেশেও এটি আসতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছিল। ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও জম্বি মাদক আনা একটি চক্র শনাক্ত করা হয়েছে। যারা আমেরিকার টেক্সাস থেকে ভয়ংকর এ মাদক দেশে আনছে। দ্রুতই চক্রটি গ্রেপ্তার হবে। তখন আরও বিস্তারিত বলা যাবে। সূত্র আরও জানায়, চক্রটি ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের জন্য মাদকটি আনছে। তবে এখনো বাংলাদেশে এটি ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করতে পারেনি।

এ বিষয়ে ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) মো. মেহেদী হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জম্বি দেশে ঢুকছে এমন সন্দেহ আমরাও করছি। কারা আনছে এবং ক্রেতা কারা এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি। এর নেপথ্যে যারা জড়িত, দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে। ডিএনসির গোয়েন্দা শাখা জানিয়েছে, সম্প্রতি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া দিনাজপুরের হিলির একটি ভিডিও বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে সেটি জম্বি মাদকের প্রতিফলন। শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল- ডেন্ডির কারণে এমনটি হতে পারে। তবে ভিডিওটি জম্বি আছে এমন অন্য দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে যুক্ত কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে নিশ্চিত হয়েছে ডিএনসি। এরপর জম্বি উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ডিএনসির কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগারের সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক এস এম রাজিবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মাংসখেকো ড্রাগ হিসেবে খ্যাত জম্বি সংশ্লিষ্ট কোনো আলামত পরীক্ষার জন্য আমাদের কাছে এখনো আসেনি। তবে জম্বি মাদক মূলত জাইলাজিন নামক চেতনানাশক ওষুধ। যা বিভিন্ন পশুর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ফেনটানিল বা হেরোইনের মতো মাদকের সঙ্গে এটি মিশিয়ে সেবন করা হয়। এর ফলে সেবনকারীদের হাঁটাচলা, আচার-আচরণ জীবন্মৃত বা জম্বিদের মতো হয়ে যায় এবং শরীরের চামড়ায় পচন ধরে। এটি অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করলে শ্বাসকষ্ট ও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হতে পারে। এদিকে জম্বি ছাড়াও দেশের মাদকের বাজার দখল করে রাখা ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইনের ঢল থামানো যাচ্ছে না। ক্রমেই নীরব বিস্তার ঘটছেই কিটামিন, কুশ, এলএসডি, আইস, ট্যাপেন্টাডলের মতো ভয়ংকর মাদকেরও। গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে দেশের ৩২ জেলার দেড় শতাধিক সীমান্ত রুট দিয়ে দেদার ঢুকছে বিভিন্ন মাদক। যা দেশের তরুণ সমাজকে দিনদিন আরও বেশি হুমকিতে ফেলছে। মাদকের টাকা জোগাড়ে বাড়ছে দেশের অপরাধ চিত্র। এসব উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের মধ্যেই প্রতি বছরের নেয় এবারও মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার প্রতিরোধ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশেও মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস পালিত হবে। এবারের মাদকবিরোধী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- বৈশ্বিক মাদক সমস্যা : চলমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ ও উদ্ভাবনী সমাধান। আজ সকাল থেকেই ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিটি জেলা কার্যালয়ে র‌্যালি ও লিফলেট বিতরণ করে দিবসটি পালন করবে ডিএনসি। রাজধানীতে মাদকবিরোধী বন্ধন নামে মৎস্য ভবন মোড় থেকে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন পর্যন্ত র‌্যালি করা হবে। র‌্যালিতে অংশ নিতে পারেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিশেষ অভিযানেও কমেনি ঢল : বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে। এরপর গত ১ মে মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়। কিন্তু অভিযানের প্রায় ২ মাস হতে চললেও থামানো যায়নি মাদকের ঢল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো দেশের বাজারে ইয়াবারই রাজত্ব চলছে।

গডফাদাররা অধরাই থাকছে : গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে ৩ স্তরে সক্রিয় সাড়ে ২২ হাজারের বেশি কারবারি। এর মধ্যে খুচরা ব্যবসায়ী ১৪ হাজার ২৪৮ জন, পাইকারি ব্যবসায়ী ৭ হাজার ২৭ জন ও গডফাদার দেড় হাজারের বেশি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- বিশেষ অভিযানেও কোনো গডফাদার ধরা পড়ছে না। যারা ধরা পড়ে তাদের বেশির ভাগই মাদকবহনের সঙ্গে জড়িত থাকে। গডফাদাররা গ্রেপ্তার না হলে মাদক নিয়ন্ত্রণে আসবে না বলে জানিয়েছেন বিশেজ্ঞরা। এদিকে ৩২ জেলার সীমান্ত পথ দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে দেশে ঢুকছে মাদক।

মাদক নির্মূলে কঠোর বার্তা ডিএনসির : ডিএনসির ডিডি (অপারেশন্স) মুকুল জ্যোতি চাকমা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্যেও ডিএনসি মাদক নির্মূলে সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বর্তমান সরকার বিশেষ অভিযান ঘোষণার পর বিভিন্ন পর্যায়ের কারবারিদের আইনের আওতায় হয়েছে। সরকার দ্রুতই আমাদের অস্ত্র দিতে যাচ্ছে। তখন অভিযানিক কার্যক্রমে আরও গতি আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights