ভারতকে পরবর্তী উত্তর আমেরিকা ভাবছে জাপানের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান মারুবেনি
অনলাইন ডেস্ক
ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশটিতে ব্যবসার পরিধি বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করতে চায় জাপানের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশন। আগামী ১০ বছরের মধ্যে ভারতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বর্তমানের তুলনায় ১০ গুণ বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উত্তর আমেরিকার মতোই ভারতের বাজারকে ভবিষ্যতের বড় প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
মারুবেনি করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসায়ুকি ওমোতো সম্প্রতি এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। অক্টোবরের মাঝামাঝি নিক্কেইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভারত একমাত্র দেশ, যেখানে বাজারের প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে রয়েছে। সামনের দিনগুলোতেও এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারতে ভোগ্যপণ্য ও উৎপাদনশিল্পের বিস্তার বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। ওমোতোর মতে, দেশটির প্রায় ৪০ কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার কাছাকাছি। পাশাপাশি অবশিষ্ট প্রায় ১০০ কোটি মানুষের আয় বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তাবাজার গড়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে মারুবেনির সর্বোচ্চ মুনাফা আসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে। সেখানে কার্যকর প্রমাণিত ব্যবসায়িক কৌশল ভারতের বাজারেও কাজে লাগাতে চায় জাপানি প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য শুরু থেকেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা সম্পদ ও জনবল বিনিয়োগের ওপর জোর দিচ্ছেন ওমোতো। তাঁর ভাষায়, মারুবেনির পরবর্তী বড় প্রবৃদ্ধির গন্তব্য এখন ভারত।
দেশটিতে ব্যবসা বিস্তারের জন্য তিনটি প্রধান কৌশল নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উৎপাদন উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা ব্যয়ের বাজার ধরতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ভারতকে ভিত্তি করে অন্যান্য উদীয়মান বাজারে কার্যক্রম সম্প্রসারণ।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গত মার্চে ‘মারুবেনি কনজ্যুমার প্ল্যাটফর্ম ইন্ডিয়া’ নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেছে তারা। খাদ্য ও পানীয়, রেস্তোরাঁ এবং ভোগ্যপণ্য খাতের বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের পাশাপাশি সেগুলোর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করাই হবে এর মূল কাজ। ভারতীয় বাজার সম্পর্কে স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগের সুবিধা পেতে নতুন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দেশটির নাগরিকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আবাসন খাতেও বিনিয়োগের পরিধি বাড়াচ্ছে মারুবেনি। ২০২০ সালে মুম্বাইয়ের আবাসন বাজারে প্রবেশের পর পুনেসহ একাধিক শহরে কার্যক্রম ছড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৬ সালে দেশটিতে পঞ্চম আবাসন প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে তারা। ভবিষ্যতে অনুকূল সুযোগ পাওয়া গেলে হায়দরাবাদ, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুতেও বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
উৎপাদন ও শিল্প খাতের সম্ভাবনাও গুরুত্ব পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনায়। বর্তমানে ভারতের মোট তামা আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে মারুবেনি। ওমোতোর ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ডাটা সেন্টার নির্মাণের বিস্তারের ফলে দেশটিতে তামার চাহিদা আরও বাড়বে। পাশাপাশি জাপানের সিটিজেন মেশিনারি ও ব্রাদার ইন্ডাস্ট্রিজের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ভারতে বাজারজাত এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ সেবাও দিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে ভারতের বাজারে ব্যবসা পরিচালনায় বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার কথাও তুলে ধরেছেন ওমোতো। তাঁর মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তিতে কার্যকর সালিসি ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং উৎপাদন খাতের বিকাশ নিশ্চিত করা জরুরি। ভারতের সেবা খাত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠলেও শিল্প উৎপাদন বাড়াতে নীতিগত উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
ভারতের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করে ওমোতো বলেন, ‘একবিংশ শতাব্দী ভারতের শতাব্দী।’ তাঁর মতে, বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে ভারতের বাজারে।
