ভুয়া শিক্ষার্থী পরিচয়ে রাশিয়ায় উত্তর কোরীয়দের দিয়ে জোরপূর্বক শ্রম

অনলাইন ডেস্ক
ভুয়া শিক্ষার্থী হিসেবে নথিভুক্ত করে উত্তর কোরীয় নাগরিকদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হচ্ছে বলে এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এ কাজে জড়িত একটি দালালচক্র জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ও শ্রম আইন এড়িয়ে কৃষি, নির্মাণ, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উত্তর কোরীয় শ্রমিক সরবরাহ করছে।

এসব শ্রমিকের আয় উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থ জোগাতেও সহায়তা করছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক সংস্থা গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্স।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সংস্থাটির কয়েক মাসের অনুসন্ধানভিত্তিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংস্থাটির দাবি, রুশ ব্যবসায়ী ভ্লাদিমির সোকোলভ পরিচালিত ‘কেএনডিআর.এসইউ’ নামের একটি শ্রমিক সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই কার্যক্রম চলছে। রাশিয়ায় প্রতিটি নিয়োগের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার রুবল (প্রায় ১ হাজার ২৪০ থেকে ১ হাজার ৮৬০ ডলার) কমিশন নেয়।

গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্সের অনুসন্ধানকারীরা সম্ভাব্য নিয়োগদাতার পরিচয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্ল্যাটফর্মটির পরিচালনা বিভাগের পরিচালক রুসলান ঝুকভ তাদের জানান, শ্রম আইন এড়াতে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের এমন কলেজে ভর্তি দেখানো হয়, যেখানে তারা বাস্তবে পড়াশোনা করেন না। এসব শ্রমিককে সপ্তাহে ছয় দিন, প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে কাজ করতে হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২০১৭ সালের একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থের জোগান বন্ধ করতে সদস্যদেশগুলোকে দেশটির শ্রমিকদের বিদেশে নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত থাকার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।

তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে বিদেশে ৩৫ হাজার ৬০০ থেকে ১ লাখ ১ হাজার ২৮০ জন উত্তর কোরীয় শ্রমিক কর্মরত ছিলেন বলে জানিয়েছে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণকারী ১১ দেশের একটি দল। তাদের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া আনুমানিক ৪৫ কোটি থেকে ৮০ কোটি ডলার আয় করেছে। একই বছর রাশিয়া উত্তর কোরীয় নাগরিকদের ৩৬ হাজারের বেশি ভিসা দেয়, যা আগের বছরের তুলনায় চার গুণ। এসব ভিসার প্রায় সবই দেওয়া হয়েছিল শিক্ষার উদ্দেশ্যে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই শ্রমিক সরবরাহব্যবস্থা ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টাকেও সহায়তা করতে পারে। সোকোলভ এমন অন্তত দুটি কর্মস্থলের প্রচার করেছেন, যেগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক-শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঝুকভ। তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে সংস্থাটি জানায়, তিনি অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা, বানোয়াট ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তার দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একটি বিশেষায়িত কলেজের শিক্ষার্থী, যারা আন্তসরকারি চুক্তির আওতায় অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং শিক্ষামূলক ও শিল্পক্ষেত্রের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের জন্য রাশিয়ায় গেছেন। সোকোলভ ও ঝুকভের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও সোকোলভের প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাক হর্স ও কেএনডিআর.এসইউ কোনও জবাব দেয়নি।

গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্সের ব্যবসা ও মানবাধিকার বিভাগের প্রধান লারা স্ট্র্যাংওয়েজ বলেন, এই শ্রমিক সরবরাহব্যবস্থা রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার গভীরতর সম্পর্কের প্রতিফলন। তার ভাষ্য, শ্রমিকদের আয় উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মসূচিতে অর্থ জোগাচ্ছে, আর তাদের শ্রম ইউক্রেন যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট রুশ শিল্পকারখানাসহ দেশটির শিল্প খাতকে সহায়তা করছে।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মস্কোর বিচ্ছিন্নতা বাড়তে থাকলে দুই দেশের সহযোগিতাও জোরদার হয়। ২০২৪ সালে দেশ দুটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদন করে। পরে ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সেনাদের সঙ্গে লড়তে হাজার হাজার উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েন করা হয়। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights