মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে প্রতিবেশীদের সহযোগিতা চায় ইরান

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ভার্সন
ইরানের পতাকা

নতুন করে আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে ইরান।

তেহরানের নিরাপত্তা প্রধান মোহসেন রেজায়ি ভবিষ্যতে কোনও যুদ্ধ হলে তা আগের চেয়ে ‘ভিন্ন’ হবে বলে সতর্ক করার পর এ বিষয়ে বিশ্লেষণ দিয়েছেন হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসির অধ্যাপক সুলতান বারাকাত।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বারাকাত বলেন, রেজায়ির বক্তব্যকে কেবল সামরিক প্রতিরোধের বার্তা বা শত্রুপক্ষকে নিরুৎসাহিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। বরং এর মাধ্যমে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে।

বারাকাত বলেন, “ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে দিতে চাইছে—নতুন এই দফার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তারা কীভাবে মোকাবিলা করবে, সে বিষয়ে তাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান ভৌগোলিকভাবে বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিবেশী। দেশটির সরাসরি স্থলসীমান্ত রয়েছে একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে। পাশাপাশি কাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। এসব দেশের অনেকের সঙ্গেই তেহরানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।

বারাকাত বলেন, এসব প্রতিবেশী দেশের কিছু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতির সঙ্গে পুরোপুরি একমত হবে না এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করতে পারে।

তিনি বলেন, “ইরান অনেক প্রতিবেশী দেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত—কেউ সরাসরি স্থলসীমান্তের মাধ্যমে, আবার কেউ কাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে। তাদের অনেকের সঙ্গেই ইরানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আমার মনে হয়, তাদের কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের কথা মোটেও শুনবে না এবং নিষেধাজ্ঞার এই নতুন দফা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।”

বারাকাতের মতে, রেজায়ির বক্তব্যের মূল বার্তাই হলো—ইরান একই সময়ে সব দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক যুদ্ধে জড়ানোর অবস্থায় নেই। ফলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সংকুচিত বা সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠুক, তা তেহরান চায় না।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি, রেজায়ি এটাই বোঝাতে চাইছেন—আমরা সবার সঙ্গে অর্থনৈতিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সামর্থ্য রাখি না।”

তবে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বড় ধরনের নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে বলে সতর্ক করেন এই বিশ্লেষক। তার মতে, নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক বাণিজ্যেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

বারাকাত বলেন, “অবশ্যই, এসব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বড় ধরনের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই ফিরে আসতে পারে—যেভাবে হরমুজ প্রণালি অবরোধের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল।”

তার মন্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ইরান কেবল সামরিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও মার্কিন চাপ মোকাবিলার পথ খুঁজছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলো যদি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখে, তাহলে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা অনেকটাই সীমিত হতে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা ও পারস্পরিক হুমকি-ধমকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তেহরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বক্তব্যে যেমন সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতির ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূমিকা নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি চাপের মধ্যে থাকায় নতুন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তেহরানের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।

ফলে রেজায়ির ‘ভবিষ্যৎ যুদ্ধ ভিন্ন হবে’—এই সতর্কবার্তার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তাটিও গুরুত্বপূর্ণ। তেহরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভাব্য সংঘাতের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান ও স্বার্থ বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights