যে কারণে হিউম্যানয়েড রোবটের আইপিও’র লাগাম টানছে চীন
অনলাইন ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির বিশ্ববাজারে দ্রুততম সময়ে মাথা তুলে দাঁড়ানো চীনের হিউম্যানয়েড রোবট (মানবসদৃশ) খাত এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য, রেকর্ড শেয়ার দর এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পর এবার লাগাম টানা হচ্ছে পুঁজিবাজারে এই খাতের বিপুল শেয়ার ছাড়ার (আইপিও) উদ্যোগে। চীনা শেয়ারবাজারের তদারকি সংস্থাগুলো হিউম্যানয়েড রোবট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়ার গতি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের আকাশচুম্বী দাবি এবং মূলধনের বড় অংশ রাজ্য-সমর্থিত প্রকল্প থেকে আসার ওপর ভিত্তি করে টেকসই আয়ের যে চিত্র দেখানো হচ্ছিল, তা নিয়ে তীব্র সংশয় দেখা দেওয়ার পরই এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন।
এই পুরো খাতে নিয়ন্ত্রণ নীতি কঠোর করার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ইউনিট্রি রোবটিক্সের সাম্প্রতিক শেয়ারবাজারের অভিজ্ঞতা। হিউম্যানয়েড এবং চতুর্দশপদী বা চার পায়ের রোবট প্রস্তুতকারক এই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার এক মাস আগে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন শুরুর পর প্রথম দিনেই পাঁচ গুণেরও বেশি লাফ দিয়েছিল। তবে বাজার খোলার সেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর থেকে এ পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ার দর তার শীর্ষ অবস্থান থেকে এক লাফে ৫৫ শতাংশ নিচে নেমে গেছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াটফোল্ড তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, হিউম্যানয়েড রোবট কোম্পানিগুলোর আইপিও পিছিয়ে দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সরাসরি বা অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘উইন্ডো গাইডেন্স’ ব্যবহার করছে। এই পদক্ষেপের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে যে, বর্তমানে হিউম্যানয়েড আইপিও প্রক্রিয়াগুলোকে কার্যত স্থবির রাখা হয়েছে। তবে অন্য এক সূত্রের মতে, নীতিগতভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি বরং এটিকে সার্বিক খাতের গতি কিছুটা থমকে দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
বেইজিংয়ের এই পদক্ষেপে এটি স্পষ্ট যে, দেশটির প্রযুক্তিখাতের অন্যতম অগ্রাধিকারভুক্ত জাতীয় খাতের উদ্ভাবনী অগ্রগতিকে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না করেই খুচরা বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত উন্মাদনাকে ঠান্ডা করার চেষ্টা চলছে। তবে চীনের সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশন (সিএসআরসির) পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইতিপূর্বে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইনফরমেশন’-এর এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল যে, সিএসআরসি সম্প্রতি কিছু বিনিয়োগ ব্যাংক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করে অনানুষ্ঠানিক নির্দেশনা দিয়েছে, যেন হিউম্যানয়েড আইপিও অনুমোদনের শর্ত ও মানদণ্ড আরও কঠোর করা হয়।
পুরো খাতের এই বিনিয়োগ জোয়ারকে প্রচারণানির্ভর উদ্ভাবন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন কিয়ানচুয়াং ক্যাপিটালের ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট লিও ওয়াং। চীনে সরকারের কোনো অগ্রাধিকারমূলক নীতি ঘোষিত হলে মূলধন ও উদ্যোক্তাদের একমুখী ঢল নামার প্রবণতাকে তিনি এভাবে উল্লেখ করেন। বেইজিং সম্প্রতি ‘এম্বোডিড ইন্টেলিজেন্স’ ভৌত দুনিয়ায় কাজ করতে সক্ষম সংবেদনশীল এআই সিস্টেম; কাউকে কৌশলগত নতুন শিল্প হিসেবে প্রচার শুরু করায় বেসরকারি মূলধন ও স্থানীয় সরকারগুলোর বিপুল তহবিল এখানে আসতে শুরু করে। ওয়াং জানান, এই খাতে তৈরি হওয়া উন্মাদনা চীনের পূর্ববর্তী ইন্টারনেট বা নবায়নযোগ্য শক্তি খাতের বিনিয়োগের জোয়ারকেও ছাড়িয়ে গেছে। অনেক শিল্প-রোবট প্রস্তুতকারক কোম্পানি রাতারাতি হিউম্যানয়েডের দিকে ঝুঁকে পড়েছে এবং নতুন স্টার্টআপগুলোর মূল্যায়ন চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, কোনো কোনো উদ্যোক্তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ডজন ডজন বিনিয়োগকারী আকর্ষণ করছিলেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া গ্রহণেও অস্বীকৃতি জানাচ্ছিলেন। তবে বাজারে এখন তার উল্টো প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এবং বেশ কিছু বেসরকারি খাতের প্রকল্পের মূল্যায়ন ইতোমধ্যেই ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কেটে ছেঁটে কমানো হয়েছে।
এই আইপিও ধীরগতির নীতি একাধিক সুপরিচিত রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করতে পারে। অন্তত আধা ডজন চীনা হিউম্যানয়েড রোবটিক্স ফার্ম বর্তমানে শেয়ারবাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মধ্যে ডিপ রোবটিক্স, এক্স স্কোয়ার রোবট এবং এজিবট অন্যতম। রেগুলেটরের এই কঠোর অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিরত থেকেছে। অন্যদিকে ইউনিট্রি রোবটিক্সও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
বর্তমানে নিয়ন্ত্রকদের মূল নজর গিয়ে পড়েছে রাজস্ব আয়ের স্থায়িত্বের ওপর। হিউম্যানয়েড রোবট বিনিয়োগকারীদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এক সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার-সমর্থিত প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে এই কোম্পানিগুলো যে আয় দেখাচ্ছে, তা কতখানি স্থায়ী ও বাস্তবসম্মত; নিয়ন্ত্রকরা এখন সেটাই খতিয়ে দেখছেন। বিশেষ করে ডাটা-সংগ্রহ কেন্দ্র তৈরি, যেখানে রোবটগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, এবং যৌথ উদ্যোগভিত্তিক প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় সরকার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত প্রাথমিক মূলধন সরবরাহ করে থাকে। এই জাতীয় প্রকল্পগুলো স্টার্টআপগুলোর প্রাইভেট-মার্কেটের ভ্যালুয়েশন বাড়াতে সাহায্য করে এবং কাগজে-কলমে আইপিওর শর্তপূরণে বড় অঙ্কের আয়ের তথ্য উপস্থাপন করে। কিন্তু নিয়ন্ত্রকদের মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই আয় কি সত্যিকারের স্বাধীন কোনো স্বতন্ত্র গ্রাহক বা বাজার চাহিদা থেকে আসছে, নাকি সরকারের টাকায় তৈরি কৃত্রিম রাজস্ব? তথ্য বলছে, এই ডাটা-সংগ্রহ কেন্দ্রের আয় বাদ দিলে অনেক রোবট কোম্পানির বাজার মূল্যায়ন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ধসে পড়তে পারে।
পণ্য কিনে আসলে গ্রাহক ঠিক কতটা সুবিধা পাচ্ছেন, তা নিয়েও বাড়ছে ধোঁয়াশা। মেক-মাইন্ড রোবটিক্সের প্রধান নির্বাহী শাও তিয়ানলান চলতি মাসে উইচ্যাটের একটি পোস্টে অভিযোগ তুলেছিলেন যে, কিছু উচ্চমূল্যায়িত এম্বোডিড-এআই প্রতিষ্ঠান আইপিও পেতে ডাটা কালেকশন সেন্টার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেনের মাধ্যমে কৃত্রিম রাজস্ব তৈরি করছে, যা একেবারেই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। তবে নিজ পোস্টের বাইরে এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। এদিকে হংকং শেয়ারবাজারে গত ১ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করা মেক-মাইন্ডের শেয়ার দরও তাদের প্রথম দিনের শীর্ষ স্থান থেকে প্রায় ২০ শতাংশ নিচে নেমে গেছে।
তবে বাজারের এই নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি মানেই যে বেইজিং রোবটিক্স খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তা মানতে নারাজ বাজার বিশ্লেষক ও নির্বাহীরা। তাদের মতে, এটি প্রযুক্তিকে ল্যাব বা প্রদর্শনীর মঞ্চ থেকে নামিয়ে কারখানার উৎপাদন লাইনে পৌঁছানোর, প্রকৃত অর্ডারের পরিমাণ বাড়ানোর এবং টেকনিক্যাল ডেমোকে একটি কার্যকর ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত করার এক বার্তা। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের সিনিয়র রিসার্চ এনালিস্ট রুইয়িং ঝাও বলেছেন, বিনিয়োগকারীদের মানসিকতা এখন ‘অন্ধ উন্মাদনা থেকে নির্বাচনী যুক্তিবাদিতার’ দিকে রূপ নিচ্ছে। পণ্য বাস্তবিক অর্থে কতটা বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে পারছে, সেই অনুযায়ী প্রিমিয়াম নির্ধারিত হচ্ছে।
এই সতর্ক অবস্থান সত্ত্বেও সার্বিকভাবে মূল ভূখণ্ডের চীন জুড়ে শেয়ারবাজারের লেনদেন পুনরুদ্ধারের পথেই রয়েছে। এলএসইজি-র সংগৃহীত তথ্যানুসারে, ২০২৬ সালের এ সময় পর্যন্ত চীনা কোম্পানিগুলো শেয়ার ও কনভার্টিবল অফারিংয়ের মাধ্যমে ১৪৮.৯ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৯ শতাংশ বেশি। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ৪১ শতাংশ মূলধন তুলেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। এশীয় ইক্যুইটি খাতের একজন প্রবীণ ব্যাংকার জানিয়েছেন, বিনিয়োগকারীরা এখনও রোবটিক্স খাতে অর্থায়নে প্রস্তুত কিন্তু তাদের চাওয়া এখন স্পষ্ট। কোম্পানিগুলোকে কেবল রোবটের নাচ-গান বা কসরত দেখালেই চলবে না বরং কারখানায় বাস্তব কাজের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করতে হবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বর্তমান বাজার বাস্তবতায় হাইপ বা প্রচারণার তুলনায় কার্যকারিতার প্রমাণ প্রদানই টিকে থাকার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
