রিসাইকেল করা প্লাস্টিক দিয়েই তৈরি হচ্ছে থ্রিডি নকশার বিস্কুট, যাবে মহাকাশেও!
অনলাইন ডেস্ক
প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে তৈরি হবে বিস্কুট; শুনতে কোনো কল্পবিজ্ঞান সিনেমার কাল্পনিক বা রূপক দৃশ্যের মতো মনে হলেও এটিই এখন বাস্তবের দ্বারপ্রান্তে। ভবিষ্যতে মহাকাশচারীদের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে নাসার অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পে সম্প্রতি এমন এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন গবেষকরা। তারা দাবি করছেন, রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক থেকে তারা বিস্কুটজাতীয় খাবার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
এই বিশেষ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় বিশেষভাবে রূপান্তরিত ইস্ট (ছত্রাক)। এটি প্লাস্টিক এবং কৃষি বর্জ্যকে ভোজ্য প্রোটিন, ফ্যাট বা চর্বি এবং ফ্লেভারে রূপান্তরিত করতে পারে। এরপর এই সম্পূর্ণ মিশ্রণটিকে একটি থ্রিডি প্রিন্টারের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত আকৃতি দিয়ে গোলাকার বিস্কুটে পরিণত করা হয়। সাউদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় কার্বনডেলের অণুজীববিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার প্রধান ড. লাহিড়ু জয়কোডি জানান, তাদের গবেষণাগার মূলত প্লাস্টিকের রিসাইক্লিং প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। সেই ভাবনা থেকেই তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, প্লাস্টিক এবং খাবার; দুটোই যেহেতু কার্বন উপাদান দিয়ে তৈরি, তাই প্লাস্টিককে কেন খাবারে রূপান্তর করা যাবে না?
শিকাগোতে আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির সভায় এই গবেষণা উপস্থাপনের আগে ড. জয়কোডি জানান, গবেষক দলটি এখনও পর্যন্ত এই প্লাস্টিকজাত বিস্কুট নিজেরা স্বাদ নিয়ে দেখেননি। কারণ মানবদেহে প্রয়োগ বা খাওয়ার জন্য এখনও প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষা করছেন তারা। তবে অনুমতি না মিললেও ঘ্রাণের দিক থেকে এই বিস্কুটগুলো ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন।
নাসার ‘ডিপ স্পেস ফুড চ্যালেঞ্জ’-এর অংশ হিসেবে এই প্রকল্পের অর্থায়ন করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের খাদ্য সংস্থান করা। মহাকাশচারীরা যখন মঙ্গল গ্রহের মতো দূরের কোনো অভিযানে যান, তখন তাদের প্রায় তিন বছরের এক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। এ ধরনের চরম বৈরী পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে সঙ্গে থাকা প্রতিটি বস্তু ও বর্জ্যকেই পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হয়।
এই খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে গবেষকরা মূলত বোতল তৈরিতে ব্যবহৃত পলিইথিলিন টেরিফথ্যালের (পিইটি) মতো বহুল ব্যবহৃত প্লাস্টিক ব্যবহার করেছেন। প্রথম ধাপে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে পানি এবং অক্সিজেনের সহায়তায় পিইটি প্লাস্টিক ভেঙে ছোট ছোট কার্বন সমৃদ্ধ অনুতে পরিণত করা হয়। পরবর্তী ধাপে জিনেটিক্যালি পরিবর্তিত ইস্টকে এই কার্বন অণুগুলো খাবার হিসেবে গ্রহণ করতে দেওয়া হয়। এই ইস্ট প্লাস্টিকের কার্বনকে প্রোটিন ও ফ্যাটসহ নতুন জৈব পুষ্টিতে রূপান্তর করে, যা পরবর্তীতে স্টার্চ বা শ্বেতসারের সঙ্গে মিশিয়ে খাবারের আকৃতি দেওয়া হয়। আলাদা এক ধরনের ইস্টের স্ট্রেইন ব্যবহার করে উদ্ভিজ্জ বর্জ্য থেকেও ভ্যানিলা ফ্লেভার তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানে এই প্রযুক্তিতে এক কেজি বিস্কুট তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় ৬০ ডলার। তবে গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে ইস্টের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন বড় পরিসরে শুরু করা সম্ভব হলে এই খরচ বহুলাংশে কমে আসবে।
গবেষক দলটির মতে, দীর্ঘ দূরত্বের মহাকাশ ভ্রমণের পাশাপাশি সাবমেরিন বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ এলাকার মতো চরম সংকটময় পরিস্থিতিতেও এই উদ্ভাবন অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এমনকি পৃথিবীব্যাপী প্লাস্টিক বর্জ্য নিরসন এবং খাদ্য সংকট মোকাবিলার এক জোড়া পরিবেশবান্ধব উপায় হিসেবেও এটি কাজ করতে পারে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে খাদ্যের চাহিদা ৩৫ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে এবং বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অণুজীব বিজ্ঞানের এই নতুন ব্যবহারের মাধ্যমে সেই বিরাট সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব বলেই তারা মনে করেন। তবে সাধারণ মানুষের পাতে এই বিস্কুট তুলে দেওয়ার আগে, প্লাস্টিক থেকে তৈরি খাবার গ্রহণের এই মানসিকতা ও ধারণার সঙ্গে জনগণকে অভ্যস্ত করে তোলাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
