রেমিট্যান্সে বদলেছে সিলেট শিল্পে নেই বিনিয়োগ

শাহ্ দিদার আলম নবেল, সিলেট

রেমিট্যান্সে বদলে গেছে সিলেটের চেহারা। শহর থেকে গ্রাম-সর্বত্র মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রাসাদসম বাড়ি। কোথাও বহুতল ভবন, কোথাও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। সড়কে বেড়েছে দামি গাড়ির বহর। বিদেশে থাকা স্বজনদের পাঠানো অর্থে বদলেছে পোশাক, জীবনযাপন ও ভোগের ধরন। অথচ যে অর্থ সিলেটে শিল্পের চাকা ঘোরাতে পারত, কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারত, সেই রেমিট্যান্সের বড় অংশই আটকে আছে ইট-পাথর, জমি আর ভোগ-বিলাসে। প্রবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চলে বিপুল অর্থের প্রবাহ থাকলেও প্রত্যাশিত হারে গড়ে ওঠেনি শিল্পকারখানা। তৈরি হয়নি বড় উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগের নতুন ধারা। ফলে রেমিট্যান্সে ব্যক্তিজীবন সমৃদ্ধ হলেও সিলেটের সামগ্রিক অর্থনীতি পাচ্ছে না সেই অনুপাতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের গতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে সিলেট বিভাগে এসেছে ২ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে এসেছে আরও ১ দশমিক ৬২৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এই বিপুল অর্থের কতটা শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রযুক্তি, পর্যটন কিংবা অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়েছে তার নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই। স্থানীয় গবেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, রেমিট্যান্সের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা, পারিবারিক ভোগ-বিলাস এবং অন্যান্য অনুৎপাদনশীল খাতে। ফলে বিদেশে শ্রম দিয়ে উপার্জিত অর্থ দেশে এলেও তার একটি বড় অংশ নতুন আয় ও কর্মসংস্থান তৈরির চক্রে ঢুকছে না। একসময় প্রবাসীরাই ছিলেন বড় বিনিয়োগকারী। চিত্রটি অবশ্য সবসময় এমন ছিল না। প্রায় তিন দশক আগেও সিলেটে নতুন কোনো বড় প্রকল্প হলে তার বিনিয়োগকারীদের তালিকায় প্রবাসীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সিলেটিরা আবাসন, বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রবণতা বদলেছে। বিনিয়োগ করে কাক্সিক্ষত রিটার্ন না পাওয়া, জমি ও ব্যবসার মালিকানা নিয়ে বিরোধ, বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব-সব মিলিয়ে দেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে অনীহা তৈরি হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জে গড়ে ওঠা হাইটেক পার্ক ছিল প্রবাসী বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম বড় সম্ভাবনা। শুরুতে বিপুল প্রবাসী বিনিয়োগের প্রত্যাশা করা হলেও বাস্তবে সেই সাড়া মেলেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবকাঠামো থাকলেই বিনিয়োগ আসে না; প্রয়োজন আস্থা, নিরাপত্তা, সহজ অনুমোদন ও বিনিয়োগের অর্থ ফেরত নেওয়ার নিশ্চয়তা। ইউকে এনআরবি সোসাইটির পরিচালক এম আহমেদ জুনেদ বলেন, সরকারের অসহযোগিতা, রাজনৈতিক প্রভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি এবং পুঁজি ফেরত নেওয়ার জটিলতা প্রবাসী বিনিয়োগের পথে বড় বাধা। তাঁর মতে, যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা বাঙালি কমিউনিটির তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহও আগের তুলনায় কমেছে। তাঁদের দেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ তৈরি করা যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights