শিল্প ধ্বংসের আরেক চক্রান্ত

জিন্নাতুন নূর
দেশের শিল্প খাতে বর্তমানে চলছে স্থবিরতা। বন্ধ হচ্ছে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগকারীরা পারছেন না নতুন শিল্পকারখানা গড়তে। শিল্প খাতের কঠিন এ সময়ে ফের বাড়ানো হচ্ছে গ্যাসের দাম। জ্বালানি বিভাগ সম্প্রতি শিল্প খাতে গ্যাসের নতুন দরের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এতে শিল্পকারখানার উদ্যোক্তাদের নতুন কারখানার গ্যাস কিনতে বর্তমান দামের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ব্যয় করতে হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন কারখানার জন্য গ্যাসের দাম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজির আমদানি ব্যয়ের সমান হবে। বিষয়টি চূড়ান্ত করতে এরই মধ্যে প্রস্তাবটি পেট্রোবাংলার মাধ্যমে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠানো হয়েছে। গতকাল বিইআরসি কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটি পেয়ে বৈঠকও করেছে।

তবে এ বিষয়ে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক এবং শুনানি শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, ‘৬৫ টাকা করে গ্যাস কিনে ৩০ টাকায় দেওয়া সম্ভব নয়। আর পুরনো শিল্পগ্রাহকদের ওপর এটি কার্যকর হবে না। আমাদের এরই মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এটি আর বাড়াতে চাই না।’

শিল্প খাতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব কী হবে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিস অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারাস অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি মো. শাহরিয়ার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত তা পাইনি। এ জন্য অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এখন যদি নতুন করে আবার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয় তাহলে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। ব্যাংক ঋণ এখন সাড়ে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ হয়েছে। গ্যাসের দাম আবার বাড়ালে শিল্প খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে। বেকার হয়ে পড়বে লাখ লাখ শ্রমিক। বেড়ে যাবে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বেজার শর্ত পূরণ করে বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন শিল্পপার্ক স্থাপন করলেও বেজা কর্তৃপক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করেছে। বিনিয়োগকারীদের শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ নিশ্চিত করতে পারেনি তারা। এজন্য অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে আসতে পারছে না। অনেকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ পায়নি। অনেকের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। এ অবস্থায় নতুন করে বাড়ানো হচ্ছে শিল্প খাতে গ্যাসের দাম। এ পরিস্থিতিতে শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিমত, নতুন শিল্পোৎপাদনে উৎসাহিত না করে উল্টো দেশীয় শিল্প খাত ধ্বংস করার নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে শিল্পের গ্রাহকদের প্রতি ঘনমিটার গ্যাস কিনতে হয় ৩০ টাকায় এবং ক্যাপটিভ পাওয়ারে (শিল্পে ব্যবহৃত নিজস্ব বিদ্যুৎ) খরচ হয় ৩০ টাকা ৭৫ পয়সা। আর এলএনজির গড় আমদানি ব্যয় ৬০-৬৫ টাকা।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, গত ২৭ ডিসেম্বর শিল্প ও ক্যাপটিভ শ্রেণিতে নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের গ্যাসের দাম এলএনজির আমদানি ব্যয়ের সমান করা হবে। তবে যেসব শিল্প ও ক্যাপটিভ গ্রাহক এরই মধ্যে সংযোগের প্রতিশ্রুতি (প্রাথমিক সম্মতিপত্র/চাহিদাপত্র ইস্যুকৃত) পেয়েছে তাদের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাসের দাম হবে বর্তমান মূল্যে। বাকি ৫০ শতাংশের দাম হবে এলএনজির দামের সমান। পুরনো শিল্প বা ক্যাপটিভ গ্রাহকরা লোড বাড়াতে চাইলে তাদের অতিরিক্ত গ্যাসের মূল্য হবে এলএনজির দামের সমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights