সংস্কার দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ, সংঘর্ষে উত্তাল প্যারিস

অনলাইন ডেস্ক

ফ্রান্সে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ করেছেন লাখো মানুষ।

স্থানীয় সময় শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে আয়োজিত এসব বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে পুলিশ। দেশজুড়ে অন্তত ৪০০ জনকে গ্রেফতার করেছে কর্তৃপক্ষ।

ফরাসি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে সারাদেশে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। এর মধ্যে শুধু প্যারিসেই ছিলেন এক লাখ ১০ হাজার বিক্ষোভকারী।

প্যারিসের প্রাণকেন্দ্র প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে বিক্ষোভকারীদের বড় জমায়েত হয়। ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতীক ম্যারিয়ানের মূর্তির নিচে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। চত্বরজুড়ে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলেও পরে এতে যুক্ত হন শিক্ষক, নার্স, মানবাধিকারকর্মী, দমকলকর্মী, অভিভাবক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ। ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরাও এতে যোগ দেন।

এক শিক্ষার্থী বলেন, সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং নিজেদের অধিকার ফিরিয়ে পেতে তারা একত্র হয়েছেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে বলেও জানান তিনি।

ফরাসি মানবাধিকার সংগঠন লিগ দে দ্রোয়া দ্য লোমের সদস্য জ্যঁ-পিয়ের বলেন, তরুণেরা ভবিষ্যৎ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমর্থকেরা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষুব্ধ। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

তিন সন্তানের এক মা বলেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকারকে চাপ দিয়ে যেতে হবে। তাদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব কেউ নিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতেই তিনি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন।

সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও গ্রেফতার
প্যারিসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন ছিল। স্থানীয় সময় শনিবার দুপুরে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকেই কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনসমাগম ঘন হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজির মর্টার ছোড়ে। একটি গাড়ি ও সংবাদপত্রের স্টলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনের কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আশপাশের এলাকা। পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্যাফে ও দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে অধিকাংশ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলে অংশ নেন।

দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় মার্সেই শহরে বিক্ষোভকারীদের একটি দল নগর ভবনে ঢুকে পড়ে এবং বিভিন্ন দোকানে লুটপাট চালায়। লিওঁ শহরে একটি পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার খবর প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঞ্জেসহ বিভিন্ন শহরে সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব ঘটনার জন্য মন্ত্রণালয় ‘অতি বামপন্থী’ গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিসের উপশহর ক্রেতেইয়ের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের সূচনা হয়। জরাজীর্ণ ভবন, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষকসংকট ও শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্যের অভিযোগ তুলে রাস্তায় নামেন শিক্ষার্থীরা।

পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত হয়। ২০১৮ সালে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া ওই আন্দোলন পরে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নিয়েছিল।

প্যারিসভিত্তিক সেন্টার ফর পলিটিক্যাল রিসার্চের গবেষক ব্রুনো কত্রেসের মতে, উচ্চ কর, বিপুল সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ শনিবারের বিক্ষোভে প্রকাশ পেয়েছে।

বিক্ষোভের আগের দিন শুক্রবার ম্যাক্রোঁ শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। তবে মানুষ ও সম্পত্তির প্রতি সম্মান দেখানো এবং ভাঙচুর থেকে বিরত থাকাও জরুরি।

এদিকে, ফ্রান্সের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ কমানোর প্রচেষ্টা এখনও বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। ফলে দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সরকারি ঋণ গ্রহণের ব্যয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী বছরের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক মেরুকরণও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে জনঅসন্তোষ মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক সংকট সামাল দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights