সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ভয়াবহতা

একটি সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো-যেখানে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান নিরাপদ থাকে। কিন্তু সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, জুলুম ও অন্যায়ভাবে সম্পদ হরণ সমাজের সেই নিরাপত্তা ও শান্তিকে মারাত্মকভাবে বিনষ্ট করে।

সন্ত্রাস বলতে এমন কর্মকাণ্ড বোঝায়, যার মাধ্যমে ভয়ভীতি, সহিংসতা, অস্ত্র, হত্যা, হামলা বা হুমকির সাহায্যে ব্যক্তি বা সমাজের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করা হয়। অন্যদিকে চাঁদাবাজি হলো ভয়ভীতি, হুমকি, প্রভাব, বল প্রয়োগ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ বা সম্পদ আদায় করা। দুটি অপরাধের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো-উভয় ক্ষেত্রেই ভয় সৃষ্টি করে অন্যের অধিকার হরণ করা হয়। সন্ত্রাসে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা আক্রান্ত হয়; চাঁদাবাজিতে মানুষের সম্পদ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আক্রান্ত হয়।

সমাজে ফ্যাসাদ সৃষ্টি নিষিদ্ধ : মানুষের জীবনের পবিত্রতা ও নিরাপত্তার অসাধারণ গুরুত্ব আছে। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি সমাজে ভয়, অস্থিরতা, অবিচার ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে। ফলে এগুলো কোরআনের ভাষায় ‘ফাসাদ ফিল-আরদ’ বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)

অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ : অন্যের সম্পদ বৈধ ব্যবসা, শ্রমের বিনিময় বা স্বেচ্ছাসম্মতির মাধ্যমে গ্রহণ না করে; বরং ভয়, হুমকি, বল বা চাপ প্রয়োগ করে আদায় করা নিষেধ। এটিই চাঁদাবাজি, যা অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণের স্পষ্ট উদাহরণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৮)

সম্পদ ও সম্মানের ওপর আঘাত অত্যন্ত গুরুতর : একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের ওপর অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

চাঁদাবাজি মানুষের সম্পদের ওপর সরাসরি আঘাত এবং অনেক ক্ষেত্রে তার সম্মান ও নিরাপত্তার ওপরও আক্রমণ। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন—‘তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সস্পদ তোমাদের জন্য হারাম (মর্যাদাপূর্ণ), যেমন তা হারাম (মর্যাদাপূর্ণ) তোমাদের এই দিনে, তোমাদের এই মাসে এবং তোমাদের এই শহরে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১২১৮)

জুলুমের পরিণতি অত্যন্ত কঠিন : সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মূলে আছে জুলুম। একজন সন্ত্রাসী যখন মানুষকে ভয় দেখায়, তার নিরাপত্তা নষ্ট করে কিংবা তার জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে, তখন সে জুলুম করে। একইভাবে চাঁদাবাজ যখন ভয় দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে, তখন সেও জুলুম করে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারসমূহে পরিণত হবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৭৪১)

অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়কারী সম্পর্কে সতর্কতা : অন্যায়ভাবে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। একজন তাওবাকারী নারী সাহাবির তাওবা প্রসঙ্গে নবী (সা.) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু বুরাইদাহ (রহ.)-এর বরাতে তাঁর পিতা থেকে হাদিস শুনিয়েছেন যে …‘সে এমন তাওবা করেছে যে একজন মাক্স গ্রহণকারীও যদি এমন তাওবা করত, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হতো।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪৩২৪)

হাদিসে ‘সাহিবু মাক্স’ বলতে অন্যায়ভাবে মানুষের কাছ থেকে অর্থ বা শুল্ক আদায়কারী ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে।

হক নষ্ট করলে শুধু তাওবা যথেষ্ট নয় : চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে বান্দার হক জড়িত। কেউ অন্যায়ভাবে কারো কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করলে শুধু মুখে তাওবা করাই যথেষ্ট নয়; সম্ভব হলে সেই অর্থ ফেরত দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার আদায় করতে হবে। নবী (সা.) বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তার সম্মান বা অন্য কিছুতে কোনো জুলুম ও অন্যায় করে থাকে, তাহলে সেদিন আসার আগেই সে যেন আজই তার নিকট হতে (ক্ষমা চাওয়া অথবা প্রতিশোধ দেওয়ার মাধ্যমে) নিজেকে মুক্ত করে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯, ৬৫৩৪; তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৯)

পরিশেষে বলা যায়, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি একটি শান্তিপূর্ণ সমাজের জন্য ভয়াবহ অভিশাপ। সন্ত্রাস মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে, আর চাঁদাবাজি মানুষের সম্পদ ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করে। উভয়ের মূলে আছে জুলুম, ভয়ভীতি, অন্যায় ও মানুষের অধিকার হরণ।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights