সহসা চালু হচ্ছে না সর্ববৃহৎ জিকে সেচ প্রকল্প, হুমকিতে ৪ জেলার কৃষি

জাহিদুজ্জামান, কুষ্টিয়া:
একেতো পদ্মায় পানি কম, তারপর সরবরাহ খাল সাময়িক বন্ধ। এ দুটি কারণে সহসা চালু হচ্ছে না দেশের সর্ববৃহৎ গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প। এতে হুমকির মুখে পড়েছে কুষ্টিয়াসহ ৪ জেলার বোরো আবাদ। সেচে বহুগুণে ব্যয় বাড়ছে। সেইসঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় মরুকরণের দিকে যাচ্ছে কুষ্টিয়া অঞ্চল।

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় একটি চ্যানেল করে পদ্মা নদী থেকে পানি এনে পাম্প করে তুলে ক্যানেলের মাধ্যমে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও মাগুরায় কৃষি জমিতে সরবরাহ করা হয় জিকে প্রকল্পের মাধ্যমে।

ভেড়ামারা পাম্প হাউজের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, জিকে প্রকল্পের প্রধান সরবরাহ খালের তিন নং ব্রিজের কাজ করছে সড়ক বিভাগ। এ কারণে মাটি ফেলে বন্ধ করে রাখা হয়েছে খাল। সড়ক বিভাগের কাজ শেষের দিকে, আগামী ৩০ তারিখে খাল উন্মুক্ত করে দেবে বলে জিকে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে।
প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, খাল উন্মুক্ত হলেও পদ্মায় পানি প্রবাহ এখন অনেক কম। সে কারণে সেচ প্রকল্পের পাম্প চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রকল্পের চ্যানেলে এখন পানি পাওয়া যাচ্ছে ৪ দশমিক ৫ আরএল মিটার। আর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে এখন গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৬ থেকে ৪ দশমিক ৭ আরএল মিটার পানি পাওয়া যাচ্ছে। এতো কম পানি দিয়ে পাম্প চালানো সম্ভব নয়- বলেন এই প্রকৌশলী। তিনি বলেন এজন্য আগামী সোমবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফরিদপুর জোনে এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে প্রকৌশলীরা বৈঠকে বসবেন বলে জানান তিনি।

সংকোচিত জিকে প্রকল্প:
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিতে একসময় বিপ্লব ঘটানো গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) প্রকল্পের কার্যক্রম সংকুচিত হতে হতে এখন ৮ ভাগের একভাগে নেমে এসেছে। পাম্প নষ্ট ও খালগুলো দখল-দূষণ হওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়ছে দেশের সর্ববৃহৎ এই সেচ প্রকল্প।

পানি উন্নয়ন বোর্ড, কুষ্টিয়ার পওর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানান, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও মাগুরার ১ লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু এই প্রকল্পের। প্রকল্পের স্বর্ণযুগে ১৯৮৩ সালে ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রকল্পের আওতায় ৯৫ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব। কিন্তু খালগুলোর বড় অংশ দখলে থাকা ও প্রকল্পের তিনটি পাম্পের মধ্যে দুটিই নষ্ট হওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে।

রাশিদুর রহমান জানান, চারটি জেলার সর্বমোট ১৩টি উপজেলায় এ কার্যক্রম বিস্তৃত। প্রকল্পের প্রধান তিনটি খাল, ৪৯টি শাখা খাল ও ৪শ ৪৪টি উপশাখা খাল রয়েছে। প্রধান খালের দৈর্ঘ্য ১৯৩ কিলোমিটার। শাখা খালগুলোর দৈর্ঘ্য ৪শ ৬৭ কিলোমিটার ও উপশাখা খালের দৈর্ঘ্য হাজার কিলোমিটার। ১৯৫১ সালে পরিচালিত প্রাথমিক জরিপের পর ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন করে।

দখল-দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে খাল:
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রধান তিনটি খাল দখলমুক্ত থাকলেও শাখা ও উপশাখা খালের বড় অংশই দখল দূষণের শিকার। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল মোড় থেকে পোড়াদহ পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে পড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক অটোরাইচ মিল। আর সবগুলো মিলই কমবেশি দখল করেছে এসব ক্যানালের জমি। ক্যানালকে দখল করে ড্রেনে পরিণত করেছে তারা, অন্যদিকে সেখানে ছাড়ছে মিলের দূষিত বর্জ্য। এতে সেচ কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষতিরমুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।

এ দখল-দূষণের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? এ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে রাশিদুর রহমান বলেন, ক্যানালগুলো পুনরুদ্ধারে প্রকল্প নিয়েও খুব একটা কাজে আসেনি। এজন্য আপাতত দখলমুক্ত করার কাজ বন্ধ রয়েছে।
তিনি জানান, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন শীর্ষক একটি প্রকল্পের পুনর্গঠিত ডিপিপি দাখিল করা হয়েছে। প্রকল্পটি পাশ হলে একবারে সব খাল দখলমুক্ত করে পুরোদমে সেচ কাজে ফিরতে চায় জিকে।

ব্যয় বাড়ছে সেচের:
এই প্রকল্পের আওতায় বছরে ৬০০ টাকায় ১ একর জমিতে ৩ মৌসুমে সেচ দিতে পারেন কৃষকরা। অন্যদিকে স্যালো মেশিন কিংবা বৈদ্যুতিক পাম্প চালিয়ে সমান পরিমাণ জমিতে সেচ দিতে কৃষকের ব্যয় হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকার মতো। এরই মধ্যে বোরো ধান লাগানো শুরু হয়ে গেছে। বেশি খরচ করেই কৃষকরা ভূগর্ভের পানি পাম্প করে সেচ দিচ্ছেন।

একসময় জিকে প্রকল্পের পানিতে ধান চাষ করতেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, অনেকে ক্যানাল দখল করে বাড়িঘর ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ফলে জিকের বড় বড় ক্যানালে পানি থাকলেও আমরা পানি পাচ্ছি না। স্যালো মেশিনের পানিতে ধান চাষে কোনো লাভ হয় না। হিসাবনিকাশ করে দেখা যায় খরচ খরচা সমান হয়ে যায়।

তবে গতবারও জিকে প্রকল্পের পানিতেই ধান চাষ করেছেন উপজেলার কাথুলিয়া গ্রামের আক্কাস আলী। তিনি বলেন, ক্যানালের পানি দিয়ে আমার ১ বিঘা জমি সেচের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের ২০০ টাকা দিতে হয় বছরে। এ টাকা কারা পায় আমি জানি না। তবে আমরা উপকার পাচ্ছি। ধান চাষের বড় খরচ সেচে হয়। অন্যান্য এলাকার চেয়ে আমরা ভালো আছি।

হুমকিতে ৪ জেলার কৃষি:
প্রকল্পের আওতাভুক্ত চার জেলার উপর দিয়ে গেছে কর্কটক্রান্তি রেখা। সাধারণ কর্কটক্রান্তি রেখা বরাবর অঞ্চল খরা প্রবণ হয়ে থাকে। সেখানে তেমন কোনো ফসল হয় না। এই সমস্যার সমাধানে গ্রহণ করা হয় গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের। প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, শুষ্ক সময়ে এখানে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। অনেক এলাকায় পানি ওঠেই না। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডসহ অনেক এলাকায় জিকে না দিলে মানুষ খাওয়ার পানিও পায় না। জিকের পানিটা উপরিভাগে থাকায় পানির স্তর সাধারণত কিছুটা উঁচুতে থাকে। জিকের পানি না থাকলে স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। এরই মধ্যে কোন কোন এলাকায় কৃষকরা মোটর দিয়ে ভূগর্ভের পানিও ভালোমতো তুলতে পারছেন না। পানি কম আসছে বলে জানান পিয়ারপুর এলাকার কৃষক আরাফাত।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, শুষ্ক মৌসুমে কুষ্টিয়ার বেশিরভাগ উপজেলার পানির উৎসের গভীরতা ২৫০ থেকে ৩৭০ ফুট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জিকে প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়লে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এই অঞ্চলের কৃষি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights