সেচ সংকটের পর প্লাবনে নষ্ট বোরো

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভয়াবহ বিপদে পড়েছে দেশের মানুষের খাবারের জোগানদাতা কৃষক। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৃদ্ধির সময়ে বোরো ক্ষেতে সেচ দিতে পারেনি কৃষক। সেচের অভাব ও দাবদাহে পুড়েছে জমির ফসল।

আর ঠিক যখন ফসল ঘরে তোলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল কৃষক, তখন হানা দিয়েছে আগাম বন্যা। তলিয়ে গেছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন হাওড়ের ধান। কালবৈশাখিতে মাটিতে মিলে গেছে ফসল। শুধু ধান নয়, ভুট্টাসহ বিভিন্ন সবজিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষির ওপর একের পর এক আঘাতে জাতীয় খাদ্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৭ এপ্রিল থেকে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওড় এলাকায় ভুগাই-কংস, সোমেশ্বরী, মগরা ও সুতাং নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের হাওড়সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে ইতোমধ্যে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা-কুশিয়ারা ও ধনু-বাউলাই নদীর পানিও দ্রুত বেড়েছে। আগামী ৭ মে পর্যন্ত এই অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নদীগুলোর পানি আরও বাড়তে পারে এবং সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে। নদীর পানি বৃদ্ধির চিত্রও উদ্বেগজনক। নেত্রকোনার জারিয়াঝাঞ্জাইল পয়েন্টে ভুগাই-কংস নদীর পানি বিপৎসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি ৭৩ সেন্টিমিটার, নেত্রকোনা পয়েন্টে মগরা নদীর পানি ৬৮ সেন্টিমিটার এবং আটপাড়া পয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। হবিগঞ্জের সুতাং রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে সুতাং নদীর পানি বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে জানা গেছে, শুধু হাওড়াঞ্চল নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও একের পর এক প্রাকৃতিক ও অবকাঠামোগত সংকটে কৃষি খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। রাজশাহী অঞ্চলে এপ্রিলজুড়ে ঘন ঘন লোডশেডিং ও তীব্র তাপপ্রবাহে সেচনির্ভর বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির অভাবে অনেক জমিতে ধানের শীষ ঠিকমতো পূর্ণতা পায়নি। এখন আবার বৃষ্টি ও কালবৈশাখির আঘাতে আধাপাকা ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামে বোরো ধান কাটার শুরুতেই টানা বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, বৃষ্টি দ্রুত না থামলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। সিলেট বিভাগে ডিজেল সংকট ও বৃষ্টির পানিতে জমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়ায় কৃষকরা সময়মতো ধান কাটতে পারছেন না। কম্বাইন হারভেস্টার থাকলেও জমিতে পানি জমে থাকায় তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে মাড়াই কাজেও ব্যাহত হচ্ছে যান্ত্রিক ব্যবহার।

মৌলভীবাজারের হাওড়গুলোতে টানা বৃষ্টিতে পানি বেড়ে আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে। কৃষকরা মাঠে নেমে ধান কাটার সুযোগ পাচ্ছেন না। সুনামগঞ্জেও একই চিত্র হাওড়ের নিচু এলাকার পাকা ও আধাপাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও আবার খলায় মাড়াই করা ধানও ডুবে গেছে। রোদ না থাকায় আগেই কাটা ধান শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ময়মনসিংহে জ্বালানি সংকট, শ্রমিকের অভাব ও যন্ত্রপাতির স্বল্পতার মধ্যে টানা বৃষ্টিতে পাকা ধান জমিতেই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। গাইবান্ধায় সেচ সংকটে ধান পূর্ণতা না পাওয়ার পর এখন বৃষ্টির পানিতে জমি ডুবে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় ধানে চিটা ধরেছে, আবার কোথাও আধাপাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রামে কালবৈশাখির তাণ্ডবে গাছপালা ও ঘরবাড়ির পাশাপাশি বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কুমিল্লায় টানা বৃষ্টি ও ঝড়ে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে, পাশাপাশি ভুট্টা, আউশের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজিরও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে কয়েক দিনের বৃষ্টিতে প্রায় এক হাজার বিঘা বোরো ধান পানির নিচে চলে গেছে। পানি আরও বাড়লে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। হবিগঞ্জে এক দিনেই ৬০০ হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে, আর মোট ক্ষতি ছাড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০০ হেক্টর।

কিশোরগঞ্জে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পানির ওপর ভাসমান ধান কেটে নিচ্ছেন। কৃষকরা বলছেন, একদিকে সেচ সংকট, অন্যদিকে বন্যা দুই দিক থেকেই তারা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু কৃষক নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। এখনই দ্রুত পানি নিষ্কাশন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা না বাড়ালে সংকট আরও গভীর হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights