সোনা চোরাচালান : আন্তর্জাতিক রুট বাংলাদেশ

মির্জা মেহেদী তমাল
সোনা পাচারের নিরাপদ ট্রানজিট রুট হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র। আকাশ, সমুদ্র ও স্থলপথ গলিয়ে সৌদি আরব, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে চোরাই পথে প্রতিদিনই দেশে আসছে সোনা। এরপর সীমান্তের চোরাই পথে সেই সোনা পাচার হয়ে যাচ্ছে ভারতে। অরক্ষিত তিন পথে (আকাশ, সমুদ্র ও স্থল) প্রতিদিন চোরাচালানের মাধ্যমে কমপক্ষে ২৫০ কোটি টাকার স্বর্ণালংকার ও বার বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পরিচালিত শতাধিক অভিযানে বিমানবন্দর থেকে মোট ১ হাজার ৮৮০ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। একই সময়ে বৈধভাবে আসা সোনার বার ও অলংকার থেকে সরকার মোট ২৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে পরিমাণ সোনা পাচার হচ্ছে উদ্ধার হওয়ার পরিমাণ যৎসামান্য। জানা গেছে, বিভিন্ন এয়ারলাইনসে করে প্রায় প্রতিদিনই অবৈধভাবে সোনার চালান আসছে বাংলাদেশে। হযরত শাহজালালসহ তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন চোরাচালানিরা। অপর দুটি চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বিভিন্ন কৌশল নিয়েও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। সোনা পাচার বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

সূত্র জানায়, শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে পাচার হয়ে আসা চোরাচালানের সোনা ভারতে আবার পাচার হয়ে যাচ্ছে। তিন পথে আসা সোনা পাচার হচ্ছে ৮টি সীমান্ত জেলার অন্তত ৯০টি পয়েন্ট দিয়ে। আর এসব সোনা চোরাচালানের সময় মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তারের ঘটনা থাকলেও তারা বাহন মাত্র। আড়ালে থেকে যাচ্ছেন বড়রা।

ঢাকা কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, বিমানবন্দরে সোনা চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি অব্যাহত আছে। সোনার চালান আনলেও অনেকে সেটি ফেলে রেখে চলে যাচ্ছেন। গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় করেও অনেক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সমন্বিত তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়া সোনার চালান আসা আগের তুলনায় কমেছে।

সব বিমানবন্দরেই সিন্ডিকেট : সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই সিন্ডিকেটগুলো শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সোনার চালান পাচার করছে। ওই সব জায়গায় তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কও রয়েছে। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে দেশের কিছু জুয়েলারি দোকান মালিকদেরও। রাজনৈতিক কানেকশনও আছে। বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীও চোরাকারবারিদের সহায়তা করছেন। প্রকৃত চোরাকারবারিদের ধারেকাছেও ভিড়তে পারছে না আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। ফলে বড় চালান ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

কাস্টমস ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, যত সোনা ধরা পড়ছে, তার কয়েক গুণ বেশি পাচার হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সোনা চোরাচালানে নিত্যনতুন কৌশল ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। চোরাকারবারিরা মধ্যপ্রাচ্যের দেশসহ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই থেকে সোনা এনে বাংলাদেশ ও পাশের দেশগুলোর বাজারে সরবরাহ করছেন। এতে বিমানবন্দরে কর্মরত ব্যক্তিদের যোগসাজশ রয়েছে।

গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চোরাচালানের সঙ্গে কারা সম্পৃক্ত। আন্তর্জাতিক একাধিক চক্রও বাংলাদেশে সক্রিয়। তারা বেশির ভাগ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করে। বাংলাদেশিরা তো রয়েছেই। এ ছাড়া ভারত, দুবাই, পাকিস্তান, সৌদি আরব, চীন, মালয়েশিয়াসহ অন্তত ১০টি দেশের মাফিয়ারা এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত। তাদের কেউ কেউ আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর একটি তালিকা করেছে। এপ্রিল মাসে ২০৯ জনের নামের ওই তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।

সীমান্তজুড়ে সক্রিয় ৯০টি রুট গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বাংলাদেশে চোরাচালান হওয়া সোনার সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। সবচেয়ে বেশি আসে দুবাই থেকে। এ তালিকায় আরও আছে ওমান, কাতার ও সৌদি আরব। এর মধ্যে দুবাইকে সোনার চোরাচালানের ‘ট্রানজিট হাব’ বলা হয়ে থাকে। দুবাই থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বড় বড় চালান বাংলাদেশে পৌঁছায় আকাশপথে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোনার বার আসে।

সূত্রমতে, এসব সোনার বেশির ভাগই দেশে ঢোকে মূলত ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে। বিভিন্ন উপায়ে আনা সোনা বিমান কর্মীদের সহায়তায় বিমানবন্দর থেকে বের করে রাজধানীর নিরাপদ স্থানে রাখা হয়। সেখান থেকে বড় চালানগুলোকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে পাঠানো হয় যশোর সীমান্তের সিন্ডিকেটের কাছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় সড়কপথের দূরপাল্লার বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, রেলপথ, এমনকি কুরিয়ার সার্ভিসকেও। ৮ সীমান্ত জেলার ৯০টি পয়েন্ট দিয়ে এসব সোনা পাচার হচ্ছে ভারতে।

সীমান্ত সিন্ডিকেটগুলো যশোরের শার্শা উপজেলার কায়বা, অগ্রভুলোট, পাঁচভুলোট, বেনাপোলের পুটখালী ও দৌলতপুর, চৌগাছা উপজেলার শাহজাদপুর, মাসিলা, কাঠগড়, আন্দুলপোতা ও কাবিলপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ এবং উত্তর চব্বিশ পরগনার এজেন্টদের হাতে পৌঁছে দেয়। সর্বশেষ যারা ভারতের চোরাকারবারিদের হাতে সোনা তুলে দেন, তারা সীমান্তসংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দা। তথ্যমতে, দুবাই থেকে ঢাকা হয়ে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারত, এটিই হলো সোনা চোরাচালানের প্রধান রুট।

সূত্র জানায়, সোনা ঢাকা থেকে যশোর সীমান্তে পৌঁছাতে তিন-চারবার হাতবদল হয় সংকেত বা পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে। মূলত যে বা যারা ঢাকা থেকে সোনা আনছে, সে জানে না সীমান্তের ওপারে কাকে বা কাদের এটি দিতে হবে। আবার যে বা যারা সীমান্ত পার করছে, সেও জানে না ঢাকার মূল মালিক কে বা কারা। মাঝপথে দু-একজন ধরা পড়লেও সে আগের বা পরের কারও তথ্য দিতে পারে না। এই জটিল কৌশলের কারণে মূলহোতারা সব সময় থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভারতে সোনার ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক থাকায় সেখানে সোনার দাম মধ্যপ্রাচ্য ও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। এই শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে চোরাকারবারিরা বাংলাদেশকে সেইফ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে।

মামলার জট ও আড়ালে থাকা গডফাদার : সোনা চোরাচালানের দায়ে আটক বাহকদের বিরুদ্ধে সাধারণত কাস্টমস অ্যাক্ট এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪-এর অধীনে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হচ্ছে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সোনা চোরাচালানের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও মাঠপর্যায়ের বাহকরাই কেবল গ্রেপ্তার হচ্ছে। মূল অর্থায়নকারী বা সিন্ডিকেটের ‘গডফাদাররা’ সব সময়ই আড়ালে থেকে যাচ্ছেন। উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষীর অভাবে অনেক সময় মূলহোতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

তদন্তে হুন্ডি সংযোগ ও পরবর্তী পদক্ষেপ

জব্দকৃত সোনা আইনি প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হচ্ছে। তবে কেবল সোনা জব্দ নয়, এর পেছনে থাকা অবৈধ অর্থ লেনদেন এবং হুন্ডি চক্রের সংযোগ মেলাতে মাঠপর্যায়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সীমান্ত ও বিমানবন্দরগুলোতে ইন্টেলিজেন্স-ভিত্তিক নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights