স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধের ঘটনায় উত্তপ্ত আজারবাইজান, সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান তুরস্কের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
স্কুলে শিক্ষার্থীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে আজারবাইজান। আজারবাইজান সরকারের নতুন স্কুল ইউনিফর্ম বিধিমালার প্রতিবাদে রাজধানী বাকুসহ দেশের একাধিক দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলায় নজিরবিহীন বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। হিজাব পরিহিত ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশে বাধা দেওয়ায় শুরু হওয়া এই অসন্তোষ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও উত্তাপ ছড়াচ্ছে, যা দেশটির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের সঙ্গে নতুন এক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি করেছে।

সম্প্রতি আজারবাইজানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় স্কুলগুলোতে ধর্মীয় প্রতীক সংবলিত পোশাক পরিধান নিষিদ্ধ করে নতুন ইউনিফর্ম বিধিমালা বাস্তবায়ন শুরু করে। এরপরই নেভি ব্লু হিজাব পরা একাধিক শিক্ষার্থী স্কুলগেটে কর্মকর্তাদের চ্যালেঞ্জ জানানোর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার জের ধরে রাজধানী বাকুর পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকা এবং ইরান সীমান্তবর্তী দক্ষিণ জেলা মাসাল্লি ও জলিলাবাদে সাধারণ নাগরিক ও অভিভাবকরা রাস্তায় নেমে আসেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, রাজধানীর বাইরের একটি স্কুলের সামনে আন্দোলনকারীরা ‌‘হিজাব শিক্ষা গ্রহণে বাধা নয়’ লেখা ব্যানার নিয়ে অবস্থান নিয়েছেন।

স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে থাকা তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ ১০.৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার এই দেশে যেকোনো ধরনের গণবিক্ষোভ অত্যন্ত বিরল। প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ ২০০৩ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন এবং দেশে বিরোধী মত দমন করতে তিনি বেশ পরিচিত।

হিজাব নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ দমন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সামাজিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ইতিমধ্যে অন্তত ৩৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনকি বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী অভিভাবক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টকে নিখোঁজ বা আটক করার অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলন তীব্র হওয়ার পর থেকেই দেশটিতে ভিপিএন ছাড়া ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপিত হয়েছে।

আজারবাইজান সাংবিধানিকভাবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ এবং সরকার ধর্মীয় প্রভাব দূর করতে অত্যন্ত কঠোর। অন্যদিকে, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ শিয়া মুসলিম হলেও তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি প্রতিবেশী তুরস্কের অত্যন্ত কাছাকাছি। আজারবাইজান দীর্ঘদিন ধরে তাদের দক্ষিণ প্রতিবেশী ইরানের সম্ভাব্য ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত। সম্প্রতি বিক্ষোভ চলাকালীন সরকারের শতাধিক ওয়েবসাইটে প্রলয়ংকরী সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে, যার দায় স্বীকার করেছে ইরানপন্থী একটি সাইবার গোষ্ঠী। অন্যদিকে, আজারবাইজানি কর্মকর্তারা এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলছেন, শিশুরা নিজেদের পছন্দে হিজাব পরে না বরং পরিবারের প্রভাবেই তা পরে; ধর্ম নির্বাচনের স্বাধীনতা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের থাকা উচিত।

সবচেয়ে বড় চমক তৈরি হয়েছে আজারবাইজানের এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে গঠিত আন্তর্জাতিক সমীকরণে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে আজারবাইজান ও তুরস্ককে ‌‘এক জাতি, দুই রাষ্ট্র’ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সরকার এই নিষেধাজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা করেছে। এরদোয়ানের প্রধান উপদেষ্টা ওকতাই সারাল আজারবাইজানের এই সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যায়িত করে ভুল সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, হিজাব শিক্ষার কোনো বাধা নয়, বরং বিশ্বাসের অংশ। এই ইস্যুতে তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টির একাধিক সংসদ সদস্য আজারবাইজান সরকারের তীব্র সমালোচনা শুরু করায় দুই ঐতিহাসিক মিত্রের সম্পর্কে এখন বেশ টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights