হরমুজের অস্থিরতা যেভাবে পানামা খালকে ঘিরে পরাশক্তিগুলোর বিরোধ উসকে দিচ্ছে

অনলাইন ডেস্ক
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যেমন বাধাগ্রস্ত হয়েই চলেছে, এর মধ্যেই হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত পানামা খালও নতুন এক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের নৌ চলাচল রুটগুলোর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ হরমুজ। আর পানামা খালের অবস্থান কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায়। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে সংকীর্ণ এই রুট।

যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছে যে, খালটিকে ঘিরে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বেইজিং এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং অভিযোগ করেছে, জলপথটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে ওয়াশিংটন এ বিষয়টি ব্যবহার করছে। দুই পক্ষের মাঝখানে থাকা পানামা এই খালটির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে যে এটি স্থায়ীভাবে নিরপেক্ষ থাকবে।

পানামা খাল কী এবং এটি কীভাবে পরিচালিত হয়?
পানামা খাল হলো ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কৃত্রিম জলপথ, যা পানামার দুটি বড় ভূখণ্ডকে যুক্তকারী সরু জমি অতিক্রম করে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। এটি জাহাজগুলোকে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত কেইপ হর্ন ঘুরে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা এড়ানোর সুযোগ দেয়। ফলে যাত্রার সময় ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

জাহাজের আকার, জাহাজের ধরন এবং বহন করা পণ্যের মতো বিভিন্ন বিষয়ের ভিত্তিতে জাহাজগুলোকে ট্রানজিট ফি দিতে হয়। মিশরের সুয়েজ খালেও একই ধরনের ফি-ভিত্তিক ব্যবস্থা রয়েছে। খালটি এক ধরনের লক ব্যবস্থা ব্যবহার করে, যার মাধ্যমে জাহাজগুলোকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ওপরে গাতুন হ্রদে তোলা হয় এবং পরে বিপরীত উপকূলে আবার নিচে নামিয়ে আনা হয়।

প্রতিটি ট্রানজিটের জন্য গাতুন হ্রদ এবং আশপাশের জলাধার থেকে কয়েক মিলিয়ন গ্যালন স্বাদু পানি ব্যবহার করতে হয়। স্বাদু পানির ওপর এই নির্ভরতা খালটিকে খরার ঝুঁকির মুখে ফেলে। পানির স্তর কমে গেলে কর্তৃপক্ষ জাহাজের সর্বোচ্চ ড্রাফটের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে, ফলে জাহাজগুলোকে কম মাল বহন করতে হয় এবং পুরো রুটটির সক্ষমতা হ্রাস পায়।

এই খালপথে চলাচল কেন বেড়েছে?
বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক শিপিং সংগঠন বাল্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সিল (বিমকো)-এর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ নাগাদ পানামা খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল আগের বছরের তুলনায় আট শতাংশ বেড়ে দৈনিক গড়ে ৩৮টি জাহাজে পৌঁছে যায়, যা জলপথটির সর্বোচ্চ সক্ষমতার কাছাকাছি। বিমকো আরও জানায়, ইরান যুদ্ধ শুরুর পরবর্তী পাঁচ সপ্তাহে ট্রানজিটের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বাড়ে।

বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ বহনকারী হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল সংঘাতের কারণে আরও কঠিন হয়ে ওঠায়, এশিয়ার ক্রেতারা ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলবর্তী সরবরাহকারীদের কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি সংগ্রহ করছে।

এই মালামালের অনেকগুলোই পানামা খাল ব্যবহার করে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অববাহিকার মধ্যে যাতায়াত করে, ফলে ট্রানজিট স্লটের চাহিদা বেড়েছে। আর এই বাড়তি চাপের কারণে অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হয়েছে, বুকিংয়ের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক পারাপারের জন্য রেকর্ড পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে।

দ্রুত ট্রানজিট নিশ্চিত করতে কিছু অপারেটর নিলামে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করেছে বলে জানা গেছে। ডালাসে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অরল্যান্ডো জে পেরেজ বলেন, হরমুজ দিয়ে যে পরিমাণ জাহাজ যায়, পানামা তেমন কোনো সংযোগস্থল নয়।

“এখানে যা পরিবহন করা হয়, তার প্রকৃতি ভিন্ন। এটি বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ শতাংশ বহন করে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪০ শতাংশ এর মধ্য দিয়ে যায়।”

“হরমুজ হলো জ্বালানি পরিবহনের সংযোগস্থল। পানামা হলো একটি প্রভাবশালী অর্থনীতির সরবরাহ শৃঙ্খলের সংযোগস্থল। দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।” খালটি ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সীমাবদ্ধতারও মুখোমুখি।

গাতুন হ্রদের পানির স্তর এখনো ঐতিহাসিক গড়ের নিচে রয়েছে। এর ফলে পানামা ক্যানাল অথরিটি (পানামা খাল নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ) কী পরিমাণ জাহাজ চলবে তার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। তারা ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন খাল দিয়ে পারাপারের অনুমতি পাওয়া জাহাজের সংখ্যা ৩৬ থেকে কমিয়ে ৩২ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, এল নিনোসহ বৃহত্তর জলবায়ুগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত কম বৃষ্টিপাত এর জন্য দায়ী।

এই বিধিনিষেধ ২০২৩ সালের তীব্র খরার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যখন জাহাজের সংখ্যা সীমিত করায় দীর্ঘ জট তৈরি হয়েছিল এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়েছিল।

খালটির ইতিহাস কী?
বিশ শতকের শুরুতে খালটি নির্মাণের পর যুক্তরাষ্ট্র এটি এবং আশপাশের ক্যানাল জোনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের আমলে আলোচনার মাধ্যমে সম্পাদিত ১৯৭৭ সালের তোরিহোস-কার্টার চুক্তি অনুযায়ী খালটির নিয়ন্ত্রণ পানামার কাছে হস্তান্তরের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়।

হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ১৯৯৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। বর্তমানে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের জন্য নিরপেক্ষতা ও প্রবেশাধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া চুক্তির আওতায় পানামা ক্যানাল অথরিটি জলপথটি পরিচালনা করে।

চীনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ কেন?
এই বিরোধের মূল বিষয় মালিকানা নয়, বরং প্রভাব। দীর্ঘদিন ধরে হংকংভিত্তিক সিকে হাচিসন তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান পানামা পোর্টস কোম্পানির মাধ্যমে খালটির প্রশান্ত ও আটলান্টিক প্রবেশমুখে অবস্থিত বালবোয়া ও ক্রিস্টোবাল বন্দর পরিচালনা করে আসছে, যা পানামার সঙ্গে এক রেয়াৎ চুক্তির অধীনে ছিল।

যদিও কোম্পানিটি বা চীনের কোনো ভূমিকাই খাল পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিল না, তারপরও বিশেষ করে বন্দর, সরবরাহব্যবস্থা ও পরিবহন অবকাঠামোতে জলপথটিকে ঘিরে চীন-সংশ্লিষ্ট উপস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন যা দিন দিন বাড়ছে।

এ বছরের শুরুতে পানামার সুপ্রিম কোর্ট সিকে হাচিসনের বন্দর রেয়াতের আইনি কাঠামোকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেওয়ার পর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

পেরেজ বলেন, “ওয়াশিংটন এমন একটি কৌশলগত সম্পদের কাছে চীন-সংশ্লিষ্ট বন্দর পরিচালনাকারীদের অবস্থান করতে দেখে, যা একসময় তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে বেইজিং মনে করে ছোট দেশ পানামার ওপর বৈধ একটি চুক্তি বাতিল করতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, খালটির নিরপেক্ষতা এখন পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

তবে ইউনিভার্সিটি অব চিলির ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সম্মানসূচক অধ্যাপক হোর্হে হেইনে এই বিরোধকে “সম্পূর্ণ অযৌক্তিক” বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তিনি উল্লেখ করেন, সিকে হাচিসনের খাল-সংলগ্ন কার্যক্রম ১৯৯৭ সাল থেকে, অর্থাৎ হংকং চীনের সার্বভৌমত্বে ফেরার কয়েক মাস আগেই শুরু হয়েছিল।

তিনি বলেন, “তারা শুধু কনটেইনার ও সংশ্লিষ্ট বন্দর কার্যক্রম পরিচালনা করে। খালটি তারা পরিচালনা করে না।”

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, চীন পানামায় অতিরিক্ত প্রভাব অর্জন করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র খালটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, যে প্রস্তাব পানামা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন আরও অভিযোগ করেছে যে, পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে চীন তাদের বন্দরগুলোতে পানামার পতাকাবাহী জাহাজের ওপর তল্লাশি বাড়িয়েছে।

চীনের প্রতিক্রিয়া কী?
এপ্রিলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এসব অভিযোগকে “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন” বলে আখ্যা দেন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিষয়টি বিকৃত করার অভিযোগ তোলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।

তিনি বলেন, “দীর্ঘ সময় ধরে পানামা খাল কে দখল করে রেখেছিল, সামরিক শক্তি দিয়ে পানামায় কে হস্তক্ষেপ করেছিল এবং নির্বিচারে এর সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাকে পদদলিত করেছিল?”

“পানামা খালকে কে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় এবং স্থায়ীভাবে নিরপেক্ষ থাকার কথা যে আন্তর্জাতিক জলপথের, তাকে নিজের ভূখণ্ডে পরিণত করতে চায়? উত্তর সবার কাছেই স্পষ্ট।”

বেইজিং বলছে, তারা পানামার সার্বভৌমত্ব এবং খালটির নিরপেক্ষ অবস্থাকে সম্মান করে।

২০২৫ সালের অগাস্টে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক বিতর্কে চীনের রাষ্ট্রদূত ফু চং বলেন, “চীনকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের মিথ্যা রটনা ও ভিত্তিহীন আক্রমণ খালটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অজুহাত ছাড়া আর কিছু নয়।”

এদিকে পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো খালটির ওপর পানামার সার্বভৌমত্বের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং এর নিরপেক্ষতাকে “নির্দিষ্ট ও বৈশ্বিক উভয় ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে একমাত্র ও সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কী কারণে এই বিরোধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে?
খালটিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতবিরোধ চলছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটের আগে থেকে। চীনা বিনিয়োগ, কৌশলগত অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বহু বছর ধরে শুধু পানামায় নয়, সমগ্র লাতিন আমেরিকায় তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বর্তমান বিরোধকে ভূরাজনৈতিক প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে এক অঞ্চলের সংঘাত অন্য অঞ্চলে প্রতিযোগিতাকে তীব্র করে তোলে।

হেইনে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট বিঘ্নের কারণে পানামার ওপর চাপ বেড়েছে এবং এই ইস্যুতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।”

পেরেজও এতে একমত। তিনি বলেন, “হরমুজ হোক বা লোহিত সাগর, আমরা একই ধরনের চিত্র বারবার দেখতে পাচ্ছি।”

“কৌশলগত জলপথকে ঘিরে বিরোধ বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত হয়।”

আর পানামা, ইয়েমেন (যেখানে বাব আল-মান্দেব প্রণালি) এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো ছোট ও মধ্যম আকারের রাষ্ট্র, যারা এসব সংকীর্ণ নৌপথ পরিচালনা করে, তাদেরই প্রায়শই “অনেক বড় শক্তিগুলোর বিরোধ থেকে সৃষ্ট ব্যয় বহন করতে হয়, অথচ সেখান থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তাদের খুবই সীমিত।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights