হাড়কাঁপানো শীতে পলিথিন ঘেরা ঘরে মানবেতর দিন যাপন মা-ছেলের

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: ২৮-১২-২৫
উত্তরের হিমেল হাওয়ায় কাঁপছে কুড়িগ্রাম। পৌষ মাসের শুরুতেই জেলায়
তাপমাত্রার পারদ নেমে এসেছে ১১ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। টানা কয়েক
দিন সূর্যের দেখা নেই, ঘন কুয়াশা আর হিমশীতল বাতাসে জনজীবন স্থবির হয়ে
পড়েছে। এমন দুঃসহ শীতের মধ্যেই কুড়িগ্রাম পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের জলিল
বিড়ির মোড় এলাকার চৌধুরীপাড়া গ্রামে পলিথিনে ঘেরা একটি ভাঙা টিনের
ঘরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন নিয়তি রাণী মহন্ত (৬২) ও তাঁর একমাত্র ছেলে।
সরকারি জায়গায় কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকা টিনের ঘরটির চারপাশে পলিথিন
টাঙানো। সেই পলিথিন দিয়েই ঠান্ডা ঠেকানোর চেষ্টা করছেন মা-ছেলে। কিন্তু
হিমশীতল বাতাস আর কুয়াশার সামনে সেই পলিথিন যেন অসহায়। রাতে শীতের
তীব্রতায় ঘরের ভেতরে থাকা দায় হয়ে পড়ে। কখনো বসে, কখনো কুঁকড়ে রাত পার
করেন তারা। অর্থের অভাবে শীতবস্ত্র কেনা তো দূরের কথা, ভাঙা ঘরটি মেরামত করার
সামর্থ্যও নেই তাদের। শীতের রাতে একটি কম্বলের অভাবে কাঁপতে কাঁপতেই ভোরের
অপেক্ষা করেন নিয়তি রাণী।
নিয়তি রাণী মহন্তর স্বামী নরেশ চন্দ্র দাস প্রায় ১৫ বছর আগে মারা যান। স্বামীর
মৃত্যুর পর মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে কোনোরকমে তিন মেয়েকে বিয়ে
দিয়েছেন তিনি। এখন শেষ বয়সে ছোট ছেলে শ্রী রিপনকে নিয়ে বেঁচে থাকার
সংগ্রাম চলছে। মা ও ছেলে দুজনেই জলিল বিড়ির কারখানায় বিড়ি বানানোর
কাজ করেন। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর যা আয় হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা তা
দিয়েই কোনোরকমে চলে তাদের দিন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিয়তি রাণী মহন্ত বলেন, “এই শীতে ঘরে থাকা যায় না।
বাতাস ঢুকে পড়ে সব দিক দিয়া। শরীর কাঁপে, বুক ব্যথা করে। স্বামী মারা যাওয়ার
পর থেকে জীবনটাই যুদ্ধ হইয়া গেছে। এখন কেউ খোঁজও নেয় না। চেয়ারম্যান-
মেম্বারের কাছে গেছিলাম বিধবা ভাতা করার জন্য, কিন্তু কিছুই হইলো না। এই
শীতে একটা কম্বলও এখনো পাই নাই।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রাসেল মিয়া বলেন, “নিয়তি রাণীর স্বামী মারা যাওয়ার পর
থেকেই পরিবারটা খুব কষ্টে আছে। সরকারি সহায়তা পেলে শেষ বয়সে অন্তত একটু
ভালোভাবে বাঁচতে পারতো।”
কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন বলেন,
“বিষয়টি এই মাত্র জানতে পারলাম। খোঁজখবর নিয়ে পরিবারটির জন্য প্রয়োজনীয়
সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।”

টানা কয়েক দিন সূর্যের দেখা না পাওয়ায় কুড়িগ্রামজুড়ে শীতের প্রকোপ
আরও বেড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। ঠান্ডার
কারণে কাজ কমে যাওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের আয়ও হ্রাস পেয়েছে। এমন
পরিস্থিতিতে নিয়তি রাণীর মতো অসহায় মানুষের জীবনে শীত যেন আরও নির্মম
হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights