হুতির হামলা, সৌদির তেলের পাইপলাইন ঠিক করতে লাগবে কয়েক সপ্তাহ

অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রধান তেল পাইপলাইন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটির মেরামত ও সার্বিক পরিচালনা স্বাভাবিক করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যাবে। এতে করে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ মারাত্মক বিঘ্নিত হওয়ার চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই জরুরি মেরামত চলাকালীন বিশ্বজুড়ে তেলের মূল্যে তীব্র ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে, আঞ্চলিক সংঘাত আরও ঘনীভূত করে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন একাধিক দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়েছে, যা রিয়াদ ও তার আন্তর্জাতিক মিত্রদের জন্য এক বিশাল সামরিক ও কূটনৈতিক বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে।

আঞ্চলিক সূত্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, পারস্য উপসাগরের মূল বাণিজ্যিক পথ অর্থাৎ হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনা ও ইরান যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরীয় বন্দরগুলোকে ব্যবহার করে আসছিল। এর অংশ হিসেবে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রসারিত প্রায় এক হাজার দুইশত কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করে ক্রুড ওয়েল পরিবহন করা হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ড্রোন হামলায় পাম্পিং স্টেশনসহ পাইপলাইনের বিভিন্ন অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌদি তেল জায়ান্ট আরামকো তাৎক্ষণিকভাবে এর মূল কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়। মেরামত কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি পুরোপুরি চালু করতে তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। বিশ্ব চাহিদার প্রায় চার শতাংশ যোগান দেওয়া এই পাইপলাইন বন্ধ হওয়ার খবরে ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দুই শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাইপলাইন বন্ধের এই ধাক্কার মধ্যেই ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা দক্ষিণ লোহিত সাগরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে নতুন করে বড় ধরণের সামরিক সাফল্য অর্জন করেছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাহিনীর কাছ থেকে হুতি ‘গ্রেটার হানিশ’ এবং ‘লেসার হানিশ’ দ্বীপদ্বয় দখল করে নিয়েছে। বাব এল-মান্দেব প্রণালি থেকে মাত্রা ১৬০ কিলোমিটার উত্তরের এই দ্বীপগুলো দখল করার মাধ্যমে কৌশলগত এই নৌপথের ওপর হুথিরা তাদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করল। শুধু তা-ই নয়, জিবুতিতে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির একেবারে কাছে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে গেছে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। সম্প্রতি তারা কৌশলগত মোখা বন্দর এবং মায়ুন দ্বীপও নিজেদের দখলে নেয়, যার বিপরীতে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

যুদ্ধকৌশল হিসেবে হুতি একদিকে আন্তর্জাতিক নৌপথে সৌদি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের অভ্যন্তরেও আন্তঃসীমান্ত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে। হুতির সামরিক মুখপাত্রের দাবি অনুযায়ী, তারা সৌদি আরবের দক্ষিণ অঞ্চলের খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমান ঘাঁটিতে একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি, তবে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বেসামরিক নাগরিকদের সতর্ক করতে সাইরেন বাজানো হয়। সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের অবশিষ্টাংশ পড়ে হতাহতের ঘটনা ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের খবর পাওয়া গেছে।

এই নতুন সামরিক প্রেক্ষাপট ইয়েমেনকে আবারও এক ভয়াবহ ও পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২২ সালে অর্জিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর এটাই হুতির সবচেয়ে বড় ও দ্রুত আঞ্চলিক প্রসার। ইয়েমেনের তায়েজ প্রদেশসহ দক্ষিণ ও পশ্চিমের মূল যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে সংঘাত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, চলমান সহিংসতায় গত কয়েক দিনে গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ শতাধিক বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও শত শত মানুষ। প্রায় আশি হাজারেরও বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়ে খোলা আকাশের নিচে কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অমানবিক জীবনযাপন করছেন। প্রয়োজনীয় খাবার, পানি ও চিকিৎসার অভাবে এই বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর অবস্থা অত্যন্ত করুণ রূপ নিয়েছে।

সূত্র: এপি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights