৫৬ বছর ধরে একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

একই আঙিনায় মসজিদে আদায় করা হয় নামাজ, আর মন্দিরে চলে দুর্গাপূজা। আজান হলে বন্ধ থাকে মন্দিরের বাদ্যযন্ত্র। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আয়োজন। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই এভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রয়েছে ৫৬ বছর ধরে।

টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার নাগরপুর সদরের চৌধুরীবাড়িতে একই উঠানে পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদ ও মন্দির। দুই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করেন। প্রশাসন বলছে, সম্প্রীতি বজায় রাখতে তারা সতর্ক রয়েছে। পূজা ঘিরে কোনো শঙ্কা নেই।

শ্রী শ্রী গণেশ চন্দ্র রায় জানান, মসজিদে আজান হলে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে আসেন। তখন মন্দিরে দুর্গাপূজার সব আয়োজন স্থগিত রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আয়োজন। এভাবেই দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে চলেছেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ কখনো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আয়োজনে বাধা দেননি।

স্থানীয়রা বলেন, মসজিদে আজানের সময় হলে মন্দিরের সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য কাউকে আলাদা করে নির্দেশ দিতে হয় না। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই দীর্ঘদিন ধরে এ রীতি চলে আসছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাগরপুর সদরের চৌধুরী বাড়িতে শ্রী পরেশ চন্দ্র ও শৈলেশ চন্দ্র প্রথমে দেবী দুর্গার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এর কয়েক বছর পর, ১৯৬২ সালে একই উঠানে মুসলমানদের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই পাশাপাশি দুই ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নাগরপুর সদরের চৌধুরীবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটি এলাকার অন্যতম বড় মন্দির। একই বাড়ির উঠানে রয়েছে চৌধুরীবাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। সীমানাপ্রাচীর ঘেরা আঙিনার পশ্চিম পাশে মন্দির এবং পূর্ব পাশে মসজিদ। মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে অজুর ব্যবস্থা।

চৌধুরীবাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা হুমায়ুন কবির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের কার্যক্রম চলছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেন। অন্যদিকে স্থানীয় মুসলমানেরা মসজিদকে কেন্দ্র করে নিজেদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন। এ নিয়ে কখনো কাউকে কিছু বলতে হয়নি। দুই সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করেন।

পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঝন্টু কুমার সাহা বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবগুলো যাতে নির্বিঘ্নে পালন করা যায়, সেদিকে মুসলমানেরা খেয়াল রাখেন। তিনি বলেন, এ দৃষ্টান্ত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক। এতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাড়বে ও হানাহানি কমবে।

নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বণিক বলেন, ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। চৌধুরী বাড়ি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। মুসলমানেরা নামাজ আদায় করেন, আর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পূজা উদ্‌যাপন করেন। বিগত বছরগুলোর মতো এবারও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদ্‌যাপিত হচ্ছে।’

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার বলেন, জেলায় এক হাজার ৩৫৭টি দুর্গাপূজার মণ্ডপ রয়েছে। এসব মণ্ডপে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পূজা উদ্‌যাপিত হচ্ছে। পূজা ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নাগরপুরের চৌধুরী বাড়িতে একই উঠানে মসজিদ ও মন্দির অবস্থিত। সেখানে দুই ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করার পাশাপাশি সম্প্রীতি বজায় রাখছেন। এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত। সেখানে কোনো শঙ্কা নেই।

টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল লাভলু বলেন, ‘আমরা সবাই এ দেশের মানুষ। যার যার ধর্ম, সে সে পালন করবে। একই আঙিনায় পূজামণ্ডপে পূজা উদ্‌যাপন ও নামাজ আদায় করা হয়, এতে কোনো সমস্যা হয় না। আমরা সবাই মিলেমিশে সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করছি। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য প্রশাসন তৎপর রয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights