অপরাধমুক্ত রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে ইমাম-খতিবদের ভূমিকা
শহিদুল ইসলাম কবির
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু সেতু, সড়ক, ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের পরিচয় হলো—মানুষ কতটা নিরাপদ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা দুর্নীতিমুক্ত, ব্যবসা-বাণিজ্য কতটা সৎ এবং সমাজে ন্যায়বিচার কতটা প্রতিষ্ঠিত। যে সমাজে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন, খাদ্যে ভেজাল মেশানো হয়, ব্যবসায় ওজনে কম দেওয়া হয়, মাদক তরুণদের বিপথগামী করে এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লুটপাট হয়, সেখানে শুধু আইন প্রয়োগ করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নৈতিক জাগরণ, সামাজিক প্রতিরোধ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
এ ক্ষেত্রে ইমাম-খতিব ও আলেম-ওলামার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মসজিদের মিম্বর থেকে উচ্চারিত সত্য, ন্যায়, সততা ও আমানতদারির শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পরিবার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ধর্মীয় নেতৃত্বের সামাজিক আস্থা ও দায়িত্ব:
গত ২৪ অক্টোবর জাতীয় ইমাম সম্মেলনে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ জাতীয় ইমাম সম্মেলনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে মসজিদ ও মেহরাবের সমাজ সংস্কার, নৈতিক চর্চা ও মানবকল্যাণমূলক ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি মসজিদকে হেদায়েত ও সমাজ উন্নয়নের কেন্দ্রে পরিণত করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, মাদক, হিংসা-বিদ্বেষ ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে জুমার খুতবা ও বয়ানের মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ইমামদের মিম্বর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই আহ্বানের তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। অপরাধ প্রতিরোধের আলোচনা শুধু মাদক, সন্ত্রাস কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ব্যবসায়িক প্রতারণা, খাদ্যে ভেজাল, দায়িত্বে অবহেলা এবং সরকারি উন্নয়নকাজে অর্থ আত্মসাতের বিরুদ্ধেও ধর্মীয় নেতৃত্বকে সোচ্চার হতে হবে।
ইবাদতের শিক্ষা জীবনে প্রতিফলিত হোক:
ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; মানুষের অধিকার রক্ষা, অর্থনৈতিক সততা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে আমানত যথাযথভাবে আদায় এবং মানুষের মধ্যে বিচার করার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূরা আল-মুতাফফিফিনে মাপে ও ওজনে কম দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে।
অতএব, নামাজ আদায় করেও কেউ যদি ব্যবসায় প্রতারণা করেন, ঘুষ গ্রহণ করেন, মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করেন কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করেন, তাহলে তাঁর ইবাদতের নৈতিক শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আসে। ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি সততা, আমানতদারি ও মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়েই ইসলামের সামাজিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয়।
সুদ, ঘুষ ও দুর্নীতি সমাজের ন্যায়ভিত্তিক কাঠামোকে দুর্বল করে। ঘুষের কারণে যোগ্য ব্যক্তি বঞ্চিত হন, নাগরিক সেবা বাধাগ্রস্ত হয় এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ঘটে। তাই ইমাম-খতিবদের উচিত এসব অন্যায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিণতি তুলে ধরা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নৈতিক শিক্ষা ও আইনের শাসন—কোনোটিই একে অপরের বিকল্প নয়; বরং পরস্পরের পরিপূরক।
মাদক ও খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ:
মাদকাসক্তি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য গভীর সংকট তৈরি করে। তরুণদের মাদক থেকে রক্ষায় অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও ধর্মীয় নেতাদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। জুমার খুতবা ও ধর্মীয় আলোচনায় মাদকের ক্ষতি তুলে ধরার পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের গুরুত্বও বোঝাতে হবে। মাদকাসক্ত মানুষকে অপমান বা সামাজিকভাবে বর্জন নয়, সুস্থ জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যবসায় ওজনে কম দেওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান মেশানো কিংবা পণ্যের প্রকৃত মান গোপন করাও মানুষের অধিকার ও স্বাস্থ্যের ওপর আঘাত। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সচেতনতার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা অধিকার রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের বোঝাতে হবে—সততা ছাড়া উপার্জনের নৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না।
উন্নয়নকাজে দুর্নীতি জনগণের আমানতের খেয়ানত:
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ কেবল আর্থিক দুর্নীতি নয়; প্রকল্পের ধরন ও ত্রুটির মাত্রা অনুযায়ী তা মানুষের জীবন ও জননিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সড়ক, সেতু, হাসপাতাল, বিদ্যালয় কিংবা সরকারি ভবন নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, ভুয়া বিল তৈরি, ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো এবং কাজ না করে অর্থ উত্তোলনের মতো অনিয়ম জনগণের সম্পদের অপচয় ঘটায়।
জনগণের করের অর্থে পরিচালিত প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্প একটি আমানত। তাই কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ঠিকাদার, প্রকল্প পরিচালক ও জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কোনো প্রকল্পে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ তদন্ত ও কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
ইমাম-খতিবরা মসজিদের মিম্বর থেকে জনগণের সম্পদ রক্ষার নৈতিক দায়িত্ব তুলে ধরতে পারেন। তবে প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রচার নয়; বরং তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ উপস্থাপন এবং আইনের আশ্রয় নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
ইমামদের মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা:
ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ ইমাম, মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় সেবকদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী চার বছরের মধ্যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় নেতাদের পর্যায়ক্রমে সরকারি সম্মানী কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো রাষ্ট্রীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ইমামদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে সম্মানী প্রদান হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও সুস্পষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে, দলীয় আনুগত্যের বিবেচনায় নয়। পাশাপাশি ইমামদের সামাজিক সমস্যা, মাদক প্রতিরোধ, পারিবারিক সংকট ও আইনগত সচেতনতা বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রয়োজন নৈতিক জাগরণ ও আইনের শাসনের সমন্বয়:
অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে ইমাম-খতিবদের ভূমিকা কার্যকর করতে জুমার আলোচনায় দুর্নীতি, মাদক, ব্যবসায়িক সততা, খাদ্যে ভেজাল, পারিবারিক দায়িত্ব ও জনসম্পদ রক্ষার বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা যেতে পারে। তরুণ ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা, ভুক্তভোগীদের যথাযথ সহায়তা দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করাও জরুরি।
তবে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, রাষ্ট্র তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, উন্নয়নকাজের মান যাচাই, দুর্নীতির জবাবদিহি এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিক—সবার জন্য আইন সমানভাবে প্রয়োগ করাই ন্যায়বিচারের পূর্বশর্ত।
ইমাম-খতিবদের বাস্তব করণীয়: মিম্বর থেকে সামাজিক পরিবর্তন-
অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে ইমাম-খতিবদের ভূমিকা শুধু খুতবা ও নসিহতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাঁদের বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটাতে হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক আচরণে। এ জন্য প্রতিটি মসজিদকে স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী নৈতিক সচেতনতা ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
প্রথমত, মাসভিত্তিক নৈতিক কর্মসূচি:
প্রতি মাসে জুমার খুতবা ও বয়ানে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে—যেমন ঘুষ ও দুর্নীতি, ব্যবসায় প্রতারণা, খাদ্যে ভেজাল, মাদক, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা সরকারি সম্পদ রক্ষা। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এসব অপরাধের ক্ষতি তুলে ধরার পাশাপাশি বাস্তব জীবনে তা পরিহারের উপায়ও বোঝাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করা: মসজিদ পরিচালনা কমিটি, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত পরামর্শসভা করা যেতে পারে। এলাকায় মাদক, কিশোর অপরাধ, পারিবারিক বিরোধ কিংবা ভোক্তা প্রতারণার মতো কোন সমস্যা বেশি তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
তৃতীয়ত, তরুণদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ: মসজিদকেন্দ্রিক পাঠচক্র, ইসলাম অনুমোদন করে এমন খেলাধুলা, স্বেচ্ছাসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন ও পেশাগত পরামর্শের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। মাদক বা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের অপমান না করে তাঁদের পরিবার, শিক্ষক ও উপযুক্ত পরামর্শদাতাদের সহায়তায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।
চতুর্থত, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ: স্থানীয় ব্যবসায়ী, বাজার সমিতি, ঠিকাদার, সরকারি কর্মকর্তা ও অন্যান্য পেশাজীবীদের নিয়ে সততা ও দায়িত্বশীলতা বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। ওজনে কম না দেওয়া, ভেজাল পণ্য বিক্রি না করা, ঘুষ বর্জন, কাজে ফাঁকি না দেওয়া এবং জনসম্পদের অপচয় রোধকে সামাজিক অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে।
পঞ্চমত, অভিযোগের সঠিক পথ দেখানো: কেউ ঘুষ, চাঁদাবাজি, খাদ্যে ভেজাল কিংবা উন্নয়নকাজে অনিয়মের শিকার হলে ইমামরা তাঁকে প্রমাণ সংরক্ষণ, নিরাপদে অভিযোগ উত্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। তবে নিজেরা তদন্তকারী বা বিচারকের ভূমিকা নেবেন না; গুজব ছড়ানো, প্রকাশ্যে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকবেন।
ষষ্ঠত, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সহায়তা: স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, চিকিৎসক, সমাজসেবী ও স্বীকৃত পুনর্বাসনসেবার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবারকে বোঝাতে হবে, আসক্তি মোকাবিলায় চিকিৎসা ও সহমর্মিতা জরুরি; একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায় জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাতে হবে।
সপ্তমত, সেবামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ: অসহায় পরিবারকে সহায়তা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহযোগিতা, রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণ, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে মসজিদের জনকল্যাণমূলক ভূমিকা বাড়ানো সম্ভব। এসব কার্যক্রমে স্বচ্ছ হিসাব ও ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
অষ্টমত, অগ্রগতি মূল্যায়ন: মসজিদ পরিচালনা কমিটির সহযোগিতায় প্রতি তিন মাসে পর্যালোচনা করা যেতে পারে—কতটি সচেতনতামূলক আলোচনা হয়েছে, কতজন তরুণ বা অভিভাবক যুক্ত হয়েছেন, কতটি পরিবার প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কী ধরনের সমন্বয় হয়েছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে এই মূল্যায়ন পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে সহায়ক হবে।
নবমত, ইমামদের প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা: ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি সামাজিক সমস্যা মোকাবিলা, প্রাথমিক মানসিক সহায়তা, পারিবারিক পরামর্শ, আইনগত সচেতনতা, তথ্য যাচাই এবং মাদক প্রতিরোধ বিষয়ে তাঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ধর্মমন্ত্রীর বক্তব্যে ইমামদের মর্যাদা ও আর্থিক সুরক্ষার যে গুরুত্ব উঠে এসেছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ নীতিমালা, ন্যায্য সম্মানী ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইমামদের এই উদ্যোগ হতে হবে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে, সবার জন্য সমান এবং প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পরিচালিত। ধর্মীয় নেতৃত্বের কাজ মানুষের বিবেক জাগানো, সামাজিক সহযোগিতা গড়ে তোলা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল অবস্থান তৈরি করা; আর অপরাধের তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মসজিদের মিম্বর থেকে শুরু হওয়া নৈতিক জাগরণ যখন বাজারের সততা, পরিবারের দায়িত্বশীলতা, তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতে প্রতিফলিত হবে, তখনই ইমামদের সামাজিক প্রভাব বাস্তব পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হবে।
উপসংহার:
ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদের বক্তব্য মসজিদ ও মেহরাবকে নৈতিকতা, সমাজ সংস্কার ও মানবকল্যাণের কেন্দ্রে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
এই বক্তব্যের তাৎপর্যকে ধারণ করে মসজিদের মিম্বর থেকে মাদক, সন্ত্রাস ও কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি, ব্যবসায়িক প্রতারণা, খাদ্যে ভেজাল এবং উন্নয়নকাজে লুটপাটের বিরুদ্ধেও নৈতিক জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, অপরাধমুক্ত রাষ্ট্র শুধু ধর্মীয় উপদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে না, আবার কেবল শাস্তির ভয়েও মানুষের বিবেক পরিবর্তিত হবে না। প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, দায়িত্বশীল নাগরিক, সৎ ব্যবসা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগের সমন্বয়।
মসজিদের মিম্বরে উচ্চারিত সততার বাণী যেন বাজারে ন্যায্যতা, সরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা, উন্নয়নকাজে গুণগত মান এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতে প্রতিফলিত হয়। এভাবেই ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের সমন্বয়ে গড়ে উঠতে পারে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অপরাধমুক্ত বাংলাদেশ।
লেখক: সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিল
ই-মেইল:shahid_kabir2007@yahoo.com
