আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণচুক্তি ডিসেম্বরে
আলী রিয়াজ
আগের ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে এসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে সরকার। তিন বছর মেয়াদি নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ কোটি ডলার নেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে এ ঋণচুক্তি সই হতে পারে। তবে নতুন ঋণের জন্য ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের সংস্কার, কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ, বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা এবং সরকারি ভর্তুকি কমানোর মতো কঠিন শর্ত পূরণ করতে হবে। আগামী সোমবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হচ্ছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সাত দিনব্যাপী বার্ষিক সভা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এতে অংশ নেবে। সভার ফাঁকে আইএমএফ প্রতিনিধিদের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন কর্মসূচির শর্ত নিয়ে মে থেকে দুই পক্ষের আলোচনা চলছে। সরাসরি ও ভার্চুয়ালি একাধিক বৈঠক হয়েছে। আগামী নভেম্বরে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করতে পারে। ওই সফরে ঋণের শর্ত ও সংস্কার কার্যক্রম চূড়ান্ত করার পর ডিসেম্বরে চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের সংস্কার ও ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগ বিলম্বের কারণে আগের ঋণ কর্মসূচি এগোয়নি। নতুন কর্মসূচিতেও আইএমএফ একই ধরনের সংস্কার চাইবে। এ বিষয়ে সংস্থাটির অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। দেশের বিশেষজ্ঞরাও এসব সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।’ তিনি বলেন, ‘সংস্কার আটকে রেখে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা সময়ের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। জাতীয় স্বার্থেই এসব সংস্কার করতে হবে। আইএমএফের মতো সংস্থা যুক্ত থাকলে সংস্কারের সময়সীমা নির্ধারিত এবং বাস্তবায়নে চাপ তৈরি হয়। দেশে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। অথচ ব্যয়ের চাহিদা মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে চাচ্ছে সরকার।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, নতুন কর্মসূচিতে সম্ভাব্য শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায় কার্যক্রম পৃথক করা, কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ, দেউলিয়াবিষয়ক আইন প্রণয়ন এবং সরকারি ভর্তুকি কমানো। এসব শর্ত আগের কর্মসূচিতেও ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। নতুন কর্মসূচিতে সংস্কার সম্পন্ন করতে আরও সময় পাওয়ার আশা করছে সরকার।
২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে আইএমএফ। ২০২২ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঋণসহায়তা চেয়ে সংস্থাটিকে চিঠি দিয়েছিল। ওই কর্মসূচির আওতায় সাত কিস্তিতে ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার ছাড় করা হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের জুনে কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একাধিক শর্ত পূরণ না হওয়ায় কর্মসূচির অগ্রগতি হয়নি। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও কঠোর শর্তের কারণে বর্তমান সরকারও আগের কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় এ অবস্থানের কথা জানানো হয়। পরে ৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য চিঠি পাঠায় সরকার। আইএমএফও নতুন কর্মসূচি নেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। আগের কর্মসূচিতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায় বিভাগ পৃথক করার শর্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি। বিষয়টি পর্যালোচনায় প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
এ ছাড়া ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সব ধরনের কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণের শর্ত ছিল। প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের সমপরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও দেওয়া হয়েছিল। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। পূরণ হয়নি ব্যাংকিং খাতে বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার শর্তও। তবে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন প্রণয়ন এবং পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার মতো কিছু অগ্রগতি হয়েছে। বিপরীতে জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানো বা যৌক্তিকীকরণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই; বরং ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের ঋণ কর্মসূচি ভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছিল। পরে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। সরকারের দাবি, সংস্কার থেকে পিছিয়ে আসার কোনো ইচ্ছা নেই। তবে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চায় তারা। নতুন ঋণ কর্মসূচিতে এ অবস্থানের প্রতিফলন কতটা ঘটে, তা নির্ভর করবে আইএমএফের সঙ্গে চলমান আলোচনা ও শর্ত চূড়ান্ত হওয়ার ওপর।
