আর্থিক সংকট ও রাজনৈতিক চাপে পদত্যাগের ঘোষণা প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্টের

অনলাইন ডেস্ক
ব্যাংক খাতে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম, আমানতকারীদের অর্থ আটকে যাওয়া এবং সরকারের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগে উত্তাল প্যারাগুয়ে। দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা।

বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানান। দেশটির অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান উয়েনো ব্যাংকের ভয়াবহ সংকটকে কেন্দ্র করে তার সরকারের ওপর এই চাপ তৈরি হয়।

পেনার শাসনামলে অল্প কয়েক বছরের মধ্যে একটি অপরিচিত ডিজিটাল ব্যাংক থেকে দেশের অন্যতম বড় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল উয়েনো ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্যারাগুয়ের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ শতাংশ তাদের গ্রাহক। কিন্তু ব্যাংকটির আর্থিক বিপর্যয়ে প্রায় ৩০ লাখ গ্রাহকের আমানত আটকে যাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

গত ২ নভেম্বর ব্যাংকটির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পেরুর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করে। এর পর থেকেই গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এতে বহু পরিবার খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে বিপাকে পড়ে। ক্ষুব্ধ আমানতকারীরা রাজপথে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ ঘটনায় ব্যাংকটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

২০২৩ সালের আগস্টে ক্ষমতা নেওয়া ৪৭ বছর বয়সি অর্থনীতিবিদ পেনার প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত ছিল। কিন্তু ব্যাংকটির সঙ্গে তার পূর্ববর্তী ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং সরকারি অর্থ জমা রাখার সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন ওঠায় রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়। তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে।

বৃহস্পতিবার পার্লামেন্ট ভবনের সামনে হাজারো মানুষ তার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। একই দিন ব্যাংক সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা এবং স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগে আইনপ্রণেতারা সর্বসম্মতিক্রমে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে ভোট দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেন পেনা।

অভিশংসনের দাবিতে একাট্টা বিরোধী ও নিজ দলের নেতারা
ব্যাংক কেলেঙ্কারি নিয়ে রাজনৈতিক চাপ শুধু বিরোধী দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গত বুধবার বিরোধী আইনপ্রণেতাদের পাশাপাশি পেনার নিজ দল কলোরাডো পার্টির কয়েকজন সদস্যও তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব আনেন। ব্যাংক পরিচালনাকারী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর শেয়ারহোল্ডার ছিলেন পেনা। জানা গেছে, গত বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত ওই গোষ্ঠীতে তার শেয়ার ছিল।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাংকটির কার্যক্রম নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে যেসব সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও পেনা উপেক্ষা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পেনার সাবেক রাজনৈতিক মিত্র ও দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হোরাসিও কার্তেস প্রকাশ্যে তার অভিশংসনের পক্ষে অবস্থান নেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে কার্তেস বলেন, ‘সরকারি, বেসরকারি ও অবসরভোগীদের অর্থ চুরির পক্ষে আমরা দাঁড়াব না। আমাদের জনগণের কথা ভাবতে হবে এবং কলোরাডো পার্টির যে মূল্যবোধ আমরা ধারণ করি, তা রক্ষা করতে হবে। প্রজাতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য আমরা প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার অভিশংসনকে সমর্থন করছি।’

কার্তেসের অবস্থানের পর কলোরাডো পার্টির আরও কয়েকজন আইনপ্রণেতা অভিশংসনের পক্ষে মত দেন। ফলে নিজ দলের মধ্যেও কার্যত সমর্থন হারান পেনা। এমন পরিস্থিতিতে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান তিনি।

পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পেনা বলেন, দেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার স্বার্থেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে থাকলে ক্ষমাও চান তিনি।

পেনা আরও বলেন, এই মুহূর্তে তার প্রধান অগ্রাধিকার হলো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখে নিজেদের সঞ্চয় জমা রাখা প্যারাগুয়ের নাগরিকদের মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করা। আমানতকারীরা যেন তাদের অর্থ ফেরত পান, সেটিই তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

কেলেঙ্কারির বিষয়টি সামনে আসার পর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও বিবৃতিতে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন পেনা। তবে বিরোধী দলের সিনেটর রাফায়েল ফিলিজোলা ঘটনাটিকে প্যারাগুয়ের গণতান্ত্রিক যুগের সবচেয়ে বড় আর্থিক জালিয়াতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

১০২০ এএম রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করেই ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত ব্যবসায় সরকারি অর্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত পেনা
সাবেক অর্থমন্ত্রী পেনা ‘সমৃদ্ধ প্যারাগুয়ে’ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের তালিকায় তার নাম রয়েছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিষেক অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া লাতিন আমেরিকার হাতে গোনা কয়েকজন প্রেসিডেন্টের একজন ছিলেন পেনা।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ ওয়াশিংটনের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা বিভিন্ন সময়ে পেনাকে ‘কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন সফরও করেন তিনি। তবে পেনার পদত্যাগের ঘোষণার পর ট্রাম্প কিংবা রুবিওর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

পেনার পর কে বসছেন প্রেসিডেন্টের চেয়ারে?
পেনার পদত্যাগের ঘোষণার পর প্যারাগুয়ের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেশটির সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, পদত্যাগপত্র কার্যকর হতে হলে প্রথমে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। সেটি গৃহীত হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

তবে উয়েনো ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে আলিয়ানারও সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

এদিকে পেনার পদত্যাগের ঘোষণার প্রায় এক ঘণ্টা পর দেশটির নিম্নকক্ষ সর্বসম্মতিক্রমে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব অনুমোদন করে। পরবর্তী ধাপে প্রস্তাবটি সিনেটে পাঠানো হবে।

সিনেটেও অভিশংসন প্রস্তাব অনুমোদিত হলে পদত্যাগের পরও পেনাকে সংসদ সদস্যের পদ ছাড়তে হতে পারে। এর ফলে সংসদ সদস্য হিসেবে পাওয়া আইনি দায়মুক্তিও হারাবেন তিনি। তখন সাধারণ আদালতে তার বিরুদ্ধে যেকোনো ফৌজদারি মামলার বিচার পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।

তথ্যসূত্র : দ্য গার্ডিয়ান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights