ইরানে এবারের বিক্ষোভ কেন আগের আন্দোলনের চেয়ে ভিন্ন

অনলাইন ডেস্ক

ইরানে সম্প্রতি শুরু হওয়া প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেশের পূর্ববর্তী আন্দোলনের চেয়ে স্বতন্ত্র ও গভীর। ডিসেম্বরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও, খুব দ্রুত এই আন্দোলন রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নে রূপ নিয়েছে, যা ইরানের রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান ফাটলকে উন্মোচিত করেছে।

বিক্ষোভের সূচনা তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজার থেকে হয়। দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার সংকটকে প্রাথমিক কারণ হিসেবে দেখা গেলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই আন্দোলন রাজনৈতিক স্লোগান ও সরকারের কাঠামোগত ব্যর্থতা তুলে ধরতে শুরু করে।

ডিসেম্বর ৩০’এর মধ্যে আন্দোলন তেহরান ছাড়িয়ে শিরাজ, ইসফাহান, আহভাজ, কেরমানশাহসহ বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিক্ষোভকে আরও বিস্তৃত করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণহানির অভিযোগ ওঠার পর পরিস্থিতি সামাজিক উত্তেজনা থেকে সরাসরি নিরাপত্তা সংকটে রূপ নেয়।

একই দিনে অন্তত ২১টি প্রদেশের ৪৬টি শহরে বিক্ষোভ হয়, যেখানে সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেয়িকে লক্ষ্য করে স্লোগান দেওয়া হয়। এটি আন্দোলনের রূপান্তরের ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হচ্ছে।

বিক্ষোভের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অর্থনৈতিক ক্ষোভ দ্রুত রাষ্ট্রের বৈধতা নিয়ে প্রশ্নে রূপ নেওয়া। অতীতে ভর্তুকি বা আংশিক ছাড় দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেতেও এবার আর সেই আস্থা কাজ করেনি। দেশজুড়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ মধ্যবিত্ত, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী একসঙ্গে রাস্তায় নামার ফলে আন্দোলন আর কোনো একক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমাজে জমে থাকা আস্থাহীনতার বিস্তৃত ও গভীর প্রতিফলন।

এছাড়া আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও আন্দোলনের ভিন্নতাকে ত্বরান্বিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সমর্থন ও হুঁশিয়ারি, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, গাজা যুদ্ধ পরবর্তী বৈশ্বিক চাপ সব মিলিয়ে এই আন্দোলনকে আগের যেকোনো আন্দোলনের তুলনায় আরও জটিল ও বহুমাত্রিক করে তুলেছে।

রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়াতেও বিভাজন দেখা যাচ্ছে। খামেনেয়ি ও বিচার বিভাগ কঠোর অবস্থান নিলেও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সংযত ও সহনশীল ভাষায় পরিস্থিতি সামলানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকায় সংযত বক্তব্যের প্রভাব সীমিত।

বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের ইরান-ইসরায়েল সংঘাত, রাজনৈতিক অভিজাতদের বিভাজন এবং সংস্কারের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা এই তিনটি কারণে ইরান নতুন এক অস্থিরতার পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই বিক্ষোভ কোনো সাময়িক অস্থিরতা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের প্রকাশ।

সূত্র: টিআরটিওয়াল্ড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights