ইরান যুদ্ধের দুই মাস: জিতলো না তবে কেউ?
অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, তখন তিনি দ্রুত এবং চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যুদ্ধের মাত্র দশ দিনের মাথায় তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, আমেরিকা ইতিমধ্যে যুদ্ধে জয়ী হয়েছে।
কিন্তু দুই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে সেই বিজয় এখনো সুদূরপরাহত। বর্তমানে লড়াই সাময়িকভাবে স্থগিত থাকলেও যুদ্ধের কোনো নিশ্চিত সমাপ্তি চোখে পড়ছে না। ওয়াশিংটন যেমন তার কৌশলগত লক্ষ্যগুলো অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে, তেমনি একটি সীমিত সংঘাত হিসেবে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন পুরো বিশ্বকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে যেখানে আদতে কারোই জয় হচ্ছে না।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ইরানি জনগণকে। গত দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাজার হাজার হামলায় ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং তিন হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। একদিকে বাইরের আক্রমণ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির কঠোর শাসন সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। দেশটিতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন রয়েছে এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে এবং দারিদ্র্য ও বেকারত্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
লেবাননের সাধারণ মানুষের ভাগ্যও এই যুদ্ধের কারণে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের পুরনো সংঘাত নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় লেবানন এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি বিমান হামলায় কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ছয় লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে যে গাজার মতো লেবাননের গ্রামগুলোকেও মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। হিজবুল্লাহর হুমকি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত এই বিশাল জনসংখ্যাকে ঘরে ফিরতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইসরায়েল।
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে চাইলেও তারা আজ এর প্রত্যক্ষ শিকার। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় দেশটির ব্যবসা ও পর্যটন খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এছাড়া ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় ইরাক, কাতার এবং কুয়েতের মতো তেল ও গ্যাস নির্ভর দেশগুলোর রপ্তানি বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ইতিমধ্যে এই অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এই যুদ্ধের উত্তাপ থেকে রেহাই পায়নি মার্কিন জনগণও। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে আমেরিকায় জ্বালানি তেলের দাম ও বিমান ভাড়া আকাশচুম্বী হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের পকেটে টান দিচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ায় মার্কিন অর্থনীতিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। যদিও ট্রাম্প ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং পারমাণবিক হুমকি বন্ধের দোহাই দিয়ে এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে মার্কিন ভোটারদের কাছে এই যুদ্ধ এখন একটি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের অবস্থান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নড়বড়ে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীন এই পরিস্থিতি থেকে কৌশলে কিছুটা সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক হওয়া সত্ত্বেও চীন আগে থেকেই বিশাল তেলের মজুদ গড়ে তুলেছিল এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকেছিল, যা তাদের তেলের দাম বৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ব্যস্ত, চীন তখন নিজেকে বিশ্ব শান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া আমেরিকার সামরিক মনোযোগ এশিয়াপ্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরে যাওয়ায় এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারের পথ আরও সুগম হয়েছে।
যুদ্ধের ডামাডোলে অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এবং জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ায় বড় বড় বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো রেকর্ড পরিমাণ লভ্যাংশ পকেটে ভরছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় গত বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে যা অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জন্য পোয়াবারো হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই কৃত্রিম মুনাফা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ উচ্চমূল্যের কারণে বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য শক্তির চাহিদা আগের চেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ওপর বিশেষ কর আরোপের দাবি জোরালো হচ্ছে।
অবশেষে এই যুদ্ধের প্রভাব ইউক্রেন এবং রাশিয়ার ক্ষেত্রেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ইউক্রেনের জন্য এই যুদ্ধ একটি দুঃসংবাদ হয়ে এসেছে কারণ আমেরিকার নজর ও সামরিক সাহায্য এখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরে গেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার অর্থনীতি তেলের দাম বাড়ার ফলে সাময়িক স্বস্তি পেলেও কৃষ্ণ সাগরে ইউক্রেনের অব্যাহত হামলার কারণে তারা সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ এমন এক গোলকধাঁধা তৈরি করেছে যেখানে কেবল মৃত্যুর মিছিল আর অর্থনৈতিক মন্দাই সার হয়েছে, আর প্রকৃত বিজয়ী হিসেবে কেউ আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি।
সিএনএনের বিশ্লেষণ
