এআইয়ের হাতে সামরিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা, পদক্ষেপ নিচ্ছে জাতিসংঘ

অনলাইন ডেস্ক
যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, নজরদারি, আগাম সতর্কতা থেকে শুরু করে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত গ্রহণেও যুক্ত হচ্ছে এআই। এতে সামরিক সিদ্ধান্তে মানুষের নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে জাতিসংঘ।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইউএনআইডিআইআর) বৃহস্পতিবার সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম চালুর পরিকল্পনা করেছে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সফটওয়্যার নির্মাতা, বিনিয়োগকারী, গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।

জেনেভাভিত্তিক ইউএনআইডিআইআরের প্রধান রবিন গেইস মঙ্গলবার জাতিসংঘে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মানুষের বিচার-বিবেচনার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পারমাণবিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এ ঝুঁকি রয়েছে।

গেইসের মতে, কোনো পর্যায়ে গিয়ে যন্ত্রের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেতে পারে, তা নির্ধারণ করা কঠিন। এই অনিশ্চয়তাই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকায় এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার সময়ও সীমিত হয়ে আসছে।

পারমাণবিক সিদ্ধান্তেও এআইয়ের ঝুঁকি

সামরিক বাহিনীতে এআইয়ের ব্যবহার কেবল অস্ত্র পরিচালনায় সীমাবদ্ধ নয়। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং সামরিক অভিযানের পরিকল্পনাতেও এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব ব্যবস্থায় ভুল তথ্য, প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা মানুষের পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো সিদ্ধান্তে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। এআইয়ের সহায়তায় কোনো সংকেত ভুলভাবে বিশ্লেষিত হলে কিংবা প্রতিপক্ষের পদক্ষেপ সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হলে সামরিক সংঘাত অনিচ্ছাকৃতভাবে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে এআই প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতাও এ ঝুঁকি মোকাবিলাকে কঠিন করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন- দুই দেশই প্রযুক্তিটির সামরিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব স্বীকার করলেও এর নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের প্রশ্নে তাদের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য দায়িত্বশীলতার কাঠামো

সামরিক এআই ব্যবহারের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতিসংঘের উদ্যোগ শুধু সরকারগুলোর আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইউএনআইডিআইআর তাদের এআই, শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক উৎকর্ষকেন্দ্রের আওতায় প্রযুক্তি শিল্পের জন্য দায়িত্বশীল আচরণের একটি কাঠামো তৈরির কাজও করছে।

এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, সামরিক কাজে ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থা যেন নির্ভরযোগ্য, পূর্বানুমানযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। এ জন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নকশা, উন্নয়ন ও ব্যবহারের সিদ্ধান্তে দায়িত্বশীলতার নীতিমালা যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে প্রস্তাবিত কাঠামোটি বাধ্যতামূলক বিধিনিষেধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণে সহায়ক স্বেচ্ছামূলক নির্দেশিকা হিসেবে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সফটওয়্যার নির্মাতা, উপঠিকাদার ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে এ কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে এআইয়ের ব্যবহারও উদ্বেগের

জাতিসংঘের উদ্যোগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রের বাইরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে এআইয়ের অপব্যবহার। এসব গোষ্ঠী ইতিমধ্যে অভিযান পরিকল্পনা, কার্যক্রম পরিচালনা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিটি ব্যবহার করছে বলে সতর্ক করেছেন গেইস।

এআইয়ের সহজলভ্যতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিটির অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ফলে সামরিক বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের ওপরও নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছে জাতিসংঘ।

চলতি বছরের গ্রীষ্মে ইউএনআইডিআর এআই, শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক একটি স্থায়ী উৎকর্ষকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। জাতিসংঘের পাঁচটি প্রধান পারমাণবিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স- এ কেন্দ্রের অর্থায়নে সহায়তা দিয়েছে।

গেইসের ভাষ্য, সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ এখন আর কোনো একটি দেশ বা রাজনৈতিক জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এ প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতি থামানো কঠিন হলেও সামরিক সিদ্ধান্তে মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং অনিচ্ছাকৃত সংঘাতের ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন জাতিসংঘের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights