একাত্তরে বাংলাদেশ সংকটে জাতিসংঘ: উদ্বিগ্ন কিন্তু অসহায় পর্যবেক্ষক

পর্যবেক্ষক
বেদ পি. নন্দা

একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণের জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বর্তমানে অনিশ্চিত হলেও, একটি সম্ভাব্য ফলাফল হলো এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন। ইতোমধ্যে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় একটি প্রভাবশালী শক্তি এবং বিশ্ব অঙ্গনে একটি প্রধান মধ্যম শক্তি হিসেবে নিজের ভূমিকা জাহির করতে শুরু করেছে এবং আশা করা হচ্ছে যে, এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর বন্ধুত্ব ও আনুগত্য লাভের জন্য ভারত, চীন এবং জাপানের মধ্যে ভবিষ্যৎ ত্রিভুজীয় প্রতিযোগিতা এশিয়ায় ক্ষমতার এক নতুন বিন্যাস ঘটাবে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বার্থের বৈশ্বিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে।

আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের জন্য, বাংলাদেশের জন্ম এবং এর পূর্ববর্তী ঘটনাবলীর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে; এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে-

১. বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ভারতের হস্তক্ষেপ জাতিসংঘের চার্টারের আর্টিকেল ২(৪) এবং ২(৭)-এর কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

২. পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের দোসরদের দ্বারা মানবাধিকারের চরম, ধারাবাহিক এবং ব্যাপক লঙ্ঘনের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের দীর্ঘস্থায়ী নীরবতা এ ধরনের ঘটনা রোধে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক মেকানিজমগুলোর পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

৩. এই সংকট আন্তর্জাতিক আইনে মানবিক হস্তক্ষেপ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের ধারণাগুলোকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

এই লেখার উদ্দেশ্য হলো জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয়তা এবং জাতিসংঘের চার্টারের আর্টিকেল ২(৪) এবং ২(৭) সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক প্রশ্ন উত্থাপন করা। নন-কলোনিয়াল পরিস্থিতিতে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, যা আমি অন্য জায়গায় আলোচনা করেছি, এবং বাংলাদেশ সংকটের আলোকে মানবিক হস্তক্ষেপের প্রকৃতি ও পরিধি, যা আমি আলাদাভাবে অধ্যয়ন করার প্রস্তাব করছি, তা এখানে আলোচনা করা হবে না।

১. সংকটের পূর্ববর্তী ঘটনাবলী:

বাংলাদেশ সংকটের উৎপত্তি ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায়, যা পাকিস্তানকে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অংশে বিভক্ত করে সৃষ্টি করেছিল। এই দুটি অংশ ভৌগোলিকভাবে ১ হাজার মাইলেরও বেশি দূরত্বে অবস্থিত ছিল এবং জাতিগত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে বিভক্ত ছিল। এই অংশগুলোকে একত্রিত রাখার একমাত্র উপাদান ছিল ধর্ম, এবং ভারতের প্রতি ঘৃণা। এর কোনোটিই স্থায়ী ঐক্য নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণিত হয়নি এবং ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে পশ্চিম পাকিস্তানি পাঞ্জাবিদের দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য পূর্ব পাকিস্তানে গুরুতর রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি করে।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে চূড়ান্ত ভাঙনের দিকে নিয়ে যাওয়া ঘটনাবলী শুরু হয় ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে, যা ছিল প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রথম নির্বাচন। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচির ভিত্তিতে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ৩১৩টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন দখল করে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্টতই পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক-জমিদার-ব্যবসায়ী-শিল্পপতি চক্রের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল, যারা নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগ দ্বারা শাসিত হওয়ার সম্ভাবনাকে বেশ আতঙ্কের সাথে দেখেছিল। পূর্ব পাকিস্তানিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একটি প্রধান হুমকি হিসেবে দেখেছিল। এর সম্ভাব্য ফলাফল হিসেবে দেখা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানি উৎপাদিত পণ্যগুলোর একটি সংরক্ষিত বাজার হারানো এবং পাট ও চায়ের মতো মূল্যবান কাঁচামাল এবং পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎসের সংকোচন।

১৯৭১ সালের শুরুর দিকে, সংবিধান প্রণয়নের জন্য ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ডাকার আলোচনার ব্যর্থতা সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে এবং পূর্ব পাকিস্তানের ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা অস্থিরতা পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শেখ মুজিবের সরকারের সাথে অসহযোগিতার ডাক এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এরপর আইন অমান্যের মতো গুরুতর ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ছিল কর দিতে অস্বীকৃতি এবং সরকারি অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সর্বাত্মক ধর্মঘট। এর সাথে সাথে বাঙালিদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসে, যা নিছক স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে সম্পূর্ণ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করতে শুরু করে।

অবশেষে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কোনো সতর্কতা ছাড়াই ঢাকায় আঘাত হানে এবং সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে, যা ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান তীব্রতার সাথে অব্যাহত ছিল। গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়; নির্বিচারে সাধারণ নাগরিকদের হত্যা করা হয়। হিন্দুদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়; সেইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, আইনজীবী, ডাক্তার, আওয়ামী লীগ নেতা এবং বাঙালি সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদেরও। এই ঘটনাগুলোর ভয়াবহতা পর্যবেক্ষকদের পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং রাজাকারদের (স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া, যারা পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগী ছিল) বিরুদ্ধে সিলেক্টিভ জেনোসাইড বা বেছে বেছে গণহত্যার অভিযোগ আনতে প্ররোচিত করে, যার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে বাঙালি নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করা।

৯ মাসের এই সন্ত্রাসের ঢেউ প্রায় ১ কোটি মানুষকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে। এটি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে এবং এর ফলে, ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর, এই দুই দেশের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তী ২ সপ্তাহের সংঘাতে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল তা ছিল ভয়ংকর- যুদ্ধের কারণে তিন কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। ১৫ লাখেরও বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়। জীবন ও বাড়িঘর পুনর্গঠনের জন্য ভারত থেকে ৯০ লাখ শরণার্থী ফিরে আসে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি রেল যোগাযোগকে ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত করে। গুরুত্বপূর্ণ রেল ও সড়ক সেতুগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। ঢাকায় জাতিসংঘের প্রধান, টনি হেগেনের মতে, বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও বেশি ছিল।

২. জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ সংকট:

এই সংকটে জাতিসংঘের ভূমিকা ছিল, খুব ভালো করে বললে, একজন উদ্বিগ্ন কিন্তু অসহায় পর্যবেক্ষকের। যদিও এটি ভারতে আসা লাখ লাখ শরণার্থীর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আংশিকভাবে গ্রহণ করেছিল, ভারত ও পাকিস্তানকে মুখোমুখি সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেওয়া মর্মান্তিক ঘটনাগুলো রোধে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার সদিচ্ছার অভাব ছিল তাদের। যতক্ষণ না ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়, ততক্ষণ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারণ পরিষদ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা সমীচীন মনে করেনি। নিরাপত্তা পরিষদ ৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে তাদের আলোচনা শুরু করে। কিন্তু সোভিয়েত ভেটো যেকোনো পদক্ষেপ আটকে দেওয়ায়, নিরাপত্তা পরিষদ বিষয়টি সাধারণ পরিষদে পাঠায়। এরপর সাধারণ পরিষদ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে এবং শেষ পর্যন্ত তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি এবং সৈন্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। তবে, ভারত এই সুপারিশগুলোকে সংকটের মূল কারণের সাথে সম্পর্কহীন, অবাস্তব এবং ফলস্বরূপ অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে।

জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে সংকটটিকে উপেক্ষা করার বা মনোযোগ দেওয়ার অযোগ্য বলে বাতিল করার জন্য অন্ধত্ব, নিষ্ঠুর উদাসীনতা, এমনকি কাপুরুষতার অভিযোগ আনা হয়তো অতিরঞ্জন হতে পারে। কারণ হয়তো অধিকাংশ জাতিরাষ্ট্রের এই উপলব্ধির কারণেই এই নিষ্ক্রিয়তা দেখা দিয়েছিল যে, জাতিসংঘে আলোচনা সংঘাতের সমাধান করবে না বরং এটিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। অথবা সম্ভবত নিষ্ক্রিয়তার কারণ ছিল এই উদ্বেগ যে পাকিস্তানের কথিত অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ একটি অস্বাস্থ্যকর উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে, অথবা হয়তো জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করলেও তা কার্যকর নাও হতে পারে। যাই হোক না কেন, সমগ্র পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাতিসংঘের অব্যবস্থাপনা এতটা গুরুতর উদ্বেগের বিষয় যে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করার জন্য এটি সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ক. জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস প্রতিষ্ঠানসমূহে আলোচনা:

জাতিসংঘের যে প্রতিষ্ঠানটি সংকটের রাজনৈতিক এবং মানবাধিকার দিকগুলো বিবেচনা করেছিল তা হলো জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের সাব-কমিশন অন প্রিভেনশন অফ ডিসক্রিমিনেশন অ্যান্ড প্রোটেকশন অফ মাইনরিটিজ। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সাথে পরামর্শমূলক মর্যাদায় থাকা ২২টি আন্তর্জাতিক এনজিওর উদ্যোগে সাব-কমিশন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে বাধ্য হয়। এই সংস্থাগুলোর পক্ষে সাব-কমিশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস-এর প্রতিনিধি জন সলজবার্গ একটি জোরালো আবেদন জানান, যাতে সাব-কমিশন কমিশন অন হিউম্যান রাইটসের প্রস্তাব ৮ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের প্রস্তাব ১২৩৫-এর অধীনে প্রাপ্ত তার পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে। তিনি সাব-কমিশনকে পূর্ব পাকিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন প্রতিবেদন তদন্ত করার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে অথবা এ ধরনের একটি তদন্তকারী সংস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কাছে সুপারিশ করতে বলেন।

প্রস্তাব ৮-এর অধীনে প্রদত্ত কর্তৃত্ব হলো এমন যেকোনো পরিস্থিতি কমিশনের কাছে পাঠানো যা সম্পর্কে সাব-কমিশনের ‘বিশ্বাস করার যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে যে এটি মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার ধারাবাহিক লঙ্ঘনের একটি প্যাটার্ন প্রকাশ করে’, এবং ‘প্রাপ্ত সকল উৎস থেকে মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতা লঙ্ঘনের তথ্য সম্বলিত’ একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করা। অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের প্রস্তাব ১২৩৫-এ সাব-কমিশনকে এভাবে ক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের পদক্ষেপকে কেবল অনুমোদনই দেয়নি, বরং কমিশনকে মানবাধিকারের ধারাবাহিক লঙ্ঘনের প্যাটার্ন প্রকাশ করে এমন পরিস্থিতিগুলোর একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করতে এবং এ ধরনের পরিস্থিতির বিষয়ে তাদের সুপারিশসহ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কাছে রিপোর্ট করতে বলেছে।

সাব-কমিশনের সংক্ষিপ্ত রেকর্ডগুলো দেখায় যে, সাব-কমিশনে ভারতীয় পর্যবেক্ষক এবং পাকিস্তানি প্রতিনিধি ছাড়া আর মাত্র তিনজন সদস্য আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে একজন আলোচনার বিরোধিতা করেছিলেন এই যুক্তিতে যে বিষয়টি জাতিসংঘের চার্টারের আর্টিকেল ২(৭)-এর আওতাভুক্ত। যদিও অন্য দুইজন অংশগ্রহণকারী পরিস্থিতির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, মাত্র একজন সদস্য সাব-কমিশনের ভূমিকা সম্পর্কে কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সাব-কমিশন ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে আলোচনা করতে খুব যথাযথভাবেই অনেক দিন ব্যয় করেছে।’ কিন্তু তার কাছে মনে হয়েছিল যে ‘যখন হাজার হাজার মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তখন সদস্যরা তাদের অনুভূতি এবং বিবেককে দমন করার দিকে ঝুঁকে পড়েন।’ তিনি আরও যোগ করেন, সাব-কমিশনের ‘নীরব থাকা উচিত নয়’। কিন্তু সাব-কমিশন নীরবই ছিল।

খ. জাতিসংঘের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহে আলোচনা:

১৯৭১ সালের জুলাই মাসে, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ সমস্যার মানবিক দিকগুলো নিয়ে কাজ করে, মূলত জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রমের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। চার মাস পর, নভেম্বরে, সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটি জাতিসংঘের পূর্ব পাকিস্তান ত্রাণ কার্যক্রমের সাফল্য এবং এটি যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল, তা নিয়ে আলোচনা করে। নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধি অবশ্য কমিটির দৃষ্টি সমস্যার রাজনৈতিক দিকগুলোর দিকে আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ‘যদি শরণার্থীর স্রোত থামাতে হয় এবং যুদ্ধ এড়াতে হয়, তবে পাকিস্তান সরকার এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হওয়া অপরিহার্য।’ নিউজিল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডস দ্বারা থার্ড কমিটিতে জমা দেওয়া একটি খসড়া প্রস্তাবেও প্রশ্নটির রাজনৈতিক দিকগুলো স্পর্শ করা হয়েছিল, যেখানে শরণার্থীদের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সাধারণ পরিষদে চূড়ান্তভাবে গৃহীত প্রস্তাবটিতে কেবল ‘সদিচ্ছাসম্পন্ন সকল ব্যক্তির একটি অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কাজ করা উচিত’ এমন একটি নিরীহ উল্লেখ ছিল। এটা উল্লেখ করা উচিত যে, সাধারণ পরিষদ যখন এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করছিল, তখন একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ ইতিমধ্যেই তার চতুর্থ দিনে প্রবেশ করেছিল।

গ. নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারণ পরিষদ বিতর্ক:

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারণ পরিষদের আলোচনাগুলো দেখায় যে বেশিরভাগ সদস্য রাষ্ট্র প্রধানত স্থিতাবস্থা পুনরুদ্ধারের বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিল; তাদের মূল চাওয়া ছিল- একটি তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি এবং বাহিনীর পারস্পরিক প্রত্যাহার। হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ, জাতিসংঘের বেশিরভাগ সদস্যের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল এই ভয়ে যে এটি একটি অস্বাস্থ্যকর উদাহরণ তৈরি করতে পারে। যুদ্ধ থামানোর আশায় সদস্যরা আঞ্চলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বাধীনতা ধারণাগুলোর অবতারণা করেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পোল্যান্ড ছিল নিরাপত্তা পরিষদের দুটি সদস্য, যারা ভারতের সাথে বারবার সমস্যার মূল কারণ খোঁজার এবং সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধান বের করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক মীমাংসা অর্জনের সাথে সমন্বয় না করে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানোকে অপর্যাপ্ত এবং অবাস্তব বলে বিবেচনা করা হয়েছিল।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, নিরাপত্তা পরিষদ ৪, ৫ এবং ৬ ডিসেম্বর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে। আলোচনার প্রথম দিনে, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে উস্কানিহীন আগ্রাসনের অভিযোগ আনে, ৩ ডিসেম্বরের আগের পূর্ব পাকিস্তানের সংকটকে অভ্যন্তরীণ এবং তাই নিরাপত্তা পরিষদের উদ্বেগের বাইরে বলে বর্ণনা করে এবং দাবি করে যে ‘ভারতকে তার আগ্রাসনের যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করার উপায় খুঁজে বের করা নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব। শুধুমাত্র নিরাপত্তা পরিষদ দ্বারা উদ্ভাবিত উপায়গুলো, যা পাকিস্তানের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, পাকিস্তানের সমর্থন এবং সহযোগিতা পাবে।’

ভারত উত্তর দেয় যে জাতিসংঘের মানবিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানে হত্যা অব্যাহত রয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিষদকে সতর্ক করে দেয় যে তারা এমন কোনো সমাধানের অংশ হবে না যার অর্থ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর নিপীড়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকা। যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, সোমালিয়া, ফ্রান্স, জাপান, চীন, সিরিয়ান আরব রিপাবলিক, বেলজিয়াম, বুরুন্ডি, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য এবং সিয়েরা লিওনের প্রতিনিধিরা তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পোল্যান্ডের প্রতিনিধিরা পূর্ব পাকিস্তানিদের ইচ্ছার কথা বিবেচনা করে একটি রাজনৈতিক মীমাংসা খোঁজার জন্য নিরাপত্তা পরিষদকে আহ্বান জানান। যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত একটি খসড়া প্রস্তাব সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিয়ে বাতিল করে।

৫ ডিসেম্বর আবারও অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে, যেখানে পাকিস্তান এবং চীন জোরপূর্বক আর্টিকেল ২(৭) প্রয়োগ করে দাবি করে যে নিরাপত্তা পরিষদের উচিত ভারতের সশস্ত্র হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানানো। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনের বিরুদ্ধে এ উপদ্বীপের সংঘাতের মূল কারণ, যা পূর্ব পাকিস্তানের দানবীয় এবং রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন, তা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনে। যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে আরেকটি প্রস্তাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দেয়। ৬ ডিসেম্বর আবারও অনুরূপ যুক্তির পুনরাবৃত্তি ঘটে যখন ভারতীয় প্রতিনিধি নিরাপত্তা পরিষদকে কিছু বাস্তবতা বিবেচনা করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘শরণার্থীরা ছিল একটি বাস্তবতা। গণহত্যা এবং নিপীড়ন ছিল একটি বাস্তবতা। সমস্ত নাগরিক অধিকারের বিলুপ্তি ছিল একটি বাস্তবতা। ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্তানের দ্বারা বিভিন্ন ধরনের উস্কানি ও আগ্রাসন ছিল একটি বাস্তবতা। বাংলাদেশ নিজেই একটি বাস্তবতা ছিল, যেমনটি ছিল ভারতের দ্বারা তার স্বীকৃতি। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদ বাস্তবতার ধারেকাছেও ছিল না।’

যেহেতু নিরাপত্তা পরিষদ অচল হয়ে পড়েছিল এবং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল না, শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে, যা অনুযায়ী তারা ১৯৫০ সালের ৩ নভেম্বরের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব ৩৭৭ (শান্তির জন্য ঐক্য) এর বিধান অনুযায়ী বিষয়টি সাধারণ পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

সাধারণ পরিষদ ৭ ডিসেম্বর দুবার বৈঠকে বসে এবং ১০৪ পক্ষে, ১১ বিপক্ষে এবং ১০ ভোটদানে বিরত থাকার মাধ্যমে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে, যা ভারত ও পাকিস্তানের তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি এবং পারস্পরিক সৈন্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। প্রস্তাবের পক্ষে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং আর্টিকেল ২(৭)-এর প্রতি সদস্যদের উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটায়। পাকিস্তান এই প্রস্তাবে তাদের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করে বলে যে, ‘পাকিস্তানের জাতীয় ঐক্য বিঘ্নিত করার কোনো চেষ্টা করা হবে না এবং সাধারণ পরিষদ কর্তৃক পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপের যেকোনো চেষ্টা পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতার নীতির মধ্যেই হবে।’

যেহেতু ভারত সাধারণ পরিষদের সুপারিশ মেনে নেয়নি, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে আবারও নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে ডাকা হয়। নিরাপত্তা পরিষদ ১২ থেকে ২১ ডিসেম্বরের মধ্যে ৭ বার বৈঠকে বসে; সোভিয়েত ইউনিয়ন তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি এবং সৈন্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে আরও একটি প্রস্তাবে ভেটো দেয় এবং অবশেষে নিরাপত্তা পরিষদ ২১ ডিসেম্বর একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে, যার মাধ্যমে তারা দাবি করে যে সৈন্য প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং সকল শত্রুতা বন্ধ কঠোরভাবে পালন করতে হবে। পরিহাসের বিষয় হলো, পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর ১৭ ডিসেম্বর যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে।

১৫ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক থেকে পাকিস্তানি প্রতিনিধির নাটকীয় ওয়াকআউট এবং ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ছাড়া, নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠকগুলোর তাৎপর্য কেবল পূর্ববর্তী যুক্তিগুলোর পুনরাবৃত্তিতেই সীমাবদ্ধ। তবে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ যখন আসন্ন হয়ে ওঠে, তখন নিরাপত্তা পরিষদে বিতর্কের সুর একটি তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির ওপর অনমনীয় জোর দেওয়া থেকে একটি রাজনৈতিক মীমাংসার জন্য নতুন উদ্বেগের দিকে সরে যায়।

উদাহরণস্বরূপ, ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়, সোভিয়েত প্রতিনিধি বলেন যে ‘অনেক প্রতিনিধি ব্যক্তিগতভাবে তাকে বলেছিলেন যে শত্রুতা বন্ধ এবং রাজনৈতিক মীমাংসার মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক সম্পর্কিত সমস্যার সমাধানে সোভিয়েত দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি সঠিক ছিল।’ সিলনের প্রতিনিধি পূর্ব পাকিস্তানে একটি রাজনৈতিক মীমাংসাকে যেকোনো সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু বলে বিবেচনা করেন এবং পাকিস্তান সরকার এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বীকৃত নেতাদের মধ্যে আলোচনাকে এটি অর্জনের একমাত্র কার্যকর ও বৈধ উপায় বলে মনে করেন।

ঘ. সংকটে জাতিসংঘ মহাসচিবের ভূমিকা:

পরিস্থিতির গুরুত্ব নিরাপত্তা পরিষদের নজরে আনার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব প্রশংসার দাবিদার। তবে, তিনি বিষয়টি নিয়ে আর অগ্রসর হননি। নিরাপত্তা পরিষদ যখন বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করার জন্য বসা সমীচীন মনে করেনি, তখন তিনি সম্ভবত সবচেয়ে কম প্রতিরোধের পথটি বেছে নিয়েছিলেন। এরপর থেকে তার প্রচেষ্টা মানবিক দিকগুলোর ওপর নিবদ্ধ ছিল, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের অক্টোবরে তিনি মধ্যস্থতার প্রস্তাব করেন। তিনি কখনোই জোরাজুরি করেননি যে একটি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডাকা উচিত, যে পরিস্থিতি তার নিজের কথাতেই ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি সম্ভাব্য হুমকিতে পরিণত হয়েছিল এবং যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও পদক্ষেপের জন্য জাতিসংঘের কার্যকারিতাকে বিরূপভাবে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। তিনি স্পষ্টভাবে বিপদটি উপলব্ধি করেছিলেন, কারণ ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত মহাসচিবের বার্ষিক প্রতিবেদনের ভূমিকায় তিনি বলেছিলেন, ‘এত বিশাল মাত্রার একটি বিপর্যয়ে, সংশ্লিষ্ট সরকার ও জনগণকে সম্ভাব্য সব উপায়ে সাহায্য করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু, আমি যেমনটি ইঙ্গিত দিয়েছি, মূল সমস্যার সমাধান তখনই সম্ভব যখন পুনর্মিলন এবং মানবিক নীতিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক সমাধান অর্জিত হয়।’ তবে, তিনি বিষয়টি আলোচনার জন্য নিরাপত্তা পরিষদে আনার জন্য আর্টিকেল ৯৯-এর অধীনে তাকে প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করেননি, কিংবা নিরাপত্তা পরিষদ বসতে রাজি না হওয়ায় তিনি সাধারণ পরিষদকে জরুরি অধিবেশনে বসার জন্যও বলেননি।

হয়তো মহাসচিব নিষ্ক্রিয় ছিলেন কারণ তিনি তার প্রচেষ্টার ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। হয়তো তিনি নিরুৎসাহিত ছিলেন, কারণ ভিয়েতনামে মীমাংসা আনার জন্য তার পূর্ববর্তী প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়েছিল। হয়তো তিনি জাতিসংঘের কাঠামোকে চাপের মুখে ফেলতে চাননি, যার স্পষ্টতই সীমিত এখতিয়ার রয়েছে। কিন্তু তিনি এই সীমাবদ্ধতাগুলোকে জাতিসংঘের নীরবতার সম্ভাব্য ফলাফলের বিপরীতে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কারণ অন্ততপক্ষে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক আলোচনা এবং এই ধরনের আলোচনা দ্বারা সৃষ্ট বিশ্ব জনমত পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারত, যাতে তারা সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে বাধ্য হতো। অথবা অন্ততপক্ষে পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসরদের দ্বারা পরিচালিত নির্মম দমন-পীড়ন বন্ধ করতে বাধ্য করত। যাই হোক না কেন, আর্টিকেল ২(৭) অবশ্যই মহাসচিবের মাথায় ছিল, কারণ বার্ষিক প্রতিবেদনের ভূমিকায় তিনি বলেছিলেন যে ভারত ও পাকিস্তান সরকারের সাথে তার যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি ‘জাতিসংঘের, এবং একই সাথে মহাসচিবের, চার্টারের অধীনে দ্বৈত দায়িত্ব সম্পর্কে তীব্রভাবে সচেতন ছিলেন— আর্টিকেল ২(৭)এর বিধান মেনে চলা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতার কাঠামোর মধ্যে মানবকল্যাণ এবং মানবিক নীতিগুলো প্রচার ও নিশ্চিত করতে সাহায্য করা।’ এটি উল্লেখ করা দরকার যে, পরিস্থিতির আলোকে আর্টিকেল ২(৭)-এর এই ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং মানবাধিকারের ব্যাপক লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো মোকাবেলায় জাতিসংঘের অতীত অনুশীলনগুলোর দ্বারা এটি সমর্থিত বলে মনে হয় না।

৩. মূল্যায়ন এবং সুপারিশ:

১২ ডিসেম্বরের নিরাপত্তা পরিষদ বিতর্কে, ভারতীয় প্রতিনিধি জাতিসংঘের দ্বিধাকে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ভারত যুদ্ধ ঘোষণা বা শুরু করেনি। বর্তমান দুর্ভাগ্যজনক সংঘাতের দিকে নিয়ে যাওয়া পরিস্থিতি তৈরির জন্য ভারত দায়ী ছিল না। একসময় পাকিস্তানের অংশ থাকা দেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা মেটাতে ভারত ইচ্ছাকৃত এবং পদ্ধতিগতভাবে অস্বীকার করেনি। ভারত সেই দমন-পীড়ন, গণহত্যা এবং নিষ্ঠুরতা স্থায়ী করেনি যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা সেই অঞ্চলের জনগণকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি গঠনের সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। ভারত সেই ৯ মাসের দীর্ঘ সময়কে পরিত্যাগ করেনি যখন বাংলাদেশের নেতা ও জনগণের সাথে একটি যুক্তিসঙ্গত রাজনৈতিক মীমাংসা গড়ে তোলা যেত। জাতিসংঘ পূর্ব বাংলায় সমস্যার মূল কারণ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। জুলাই এবং আগস্ট মাসে নিরাপত্তা পরিষদে অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ ইঙ্গিত দেয় যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, অভ্যন্তরীণ এখতিয়ারের মতবাদের প্রতি তার প্রতিশ্রুতির কারণে জন্ম নেওয়া সীমাবদ্ধতার জন্য, এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে না। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র এবং পাকিস্তানের দ্বারা চার্টারের আর্টিকেল ৫৫ এবং ৫৬-এর বিধানগুলোর প্রত্যক্ষ লঙ্ঘনের মুখে, নিরাপত্তা পরিষদ এবং জাতিসংঘের এমন অবস্থানে থাকা উচিত ছিল যাতে তারা হস্তক্ষেপ করে পাকিস্তানকে যুক্তির পথে ফিরে আসতে রাজি করাতে পারত। তা হয়নি। যখন ঘটনাগুলো বর্তমান ট্র্যাজেডির দিকে তার অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছিল, জাতিসংঘ তখন অভ্যন্তরীণ এখতিয়ারের বিবেচনা দ্বারা বাধাগ্রস্ত হতে থাকে।’

জাতিসংঘ সংকট প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে পূর্ব পাকিস্তানে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বোপরি, তারা পক্ষগুলোকে রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছাতে প্ররোচিত বা বাধ্য করার চেষ্টাও করতে ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধ শেষ। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এবং আর্টিকেল ২(৪)-এর প্রযুক্তিগত লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, কারণ ভারতের এই দাবির পরও যে তারা কেবল আত্মরক্ষার্থে এবং পাকিস্তানি বিমানগুলো ভারতের বেশ কয়েকটি শহরে বোমা বর্ষণের পরেই যুদ্ধে নেমেছিল, এবং পাকিস্তান ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ শুরু করেছিল, আসল সত্য হলো ১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে, ভারত-পাকিস্তান সংঘাত প্রায় অনিবার্য বলে মনে হচ্ছিল। এবং এটা বলা মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, ভারত যদি আত্মরক্ষার ভিত্তিতে তাদের পদক্ষেপকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে নাও পারত, তবুও তারা বিদ্রোহী বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে সশস্ত্র বাহিনী পাঠাতে মানবিক হস্তক্ষেপের মতবাদের প্রয়োগ করত।

এখানে তিনটি প্রধান প্রশ্ন রয়েছে-

১. সংকটের সময় মহাসচিব এবং জাতিসংঘের সদস্যদের দ্বারা আর্টিকেল ২(৭)-এর ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছিল তা কি বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মত এবং কার্যকরী?

২. আর্টিকেল ২(৪)-এর কার্যকারিতা সম্পর্কিত প্রত্যাশাগুলো কি এতটাই বদলে গেছে যে এটি আসলে মৃত, যেমনটি অধ্যাপক টমাস ফ্র্যাঙ্ক ১৯৭০ সালে প্রস্তাব করেছিলেন?

৩. ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে, চূড়ান্ত সংকট এড়াতে জাতিসংঘের কী করা উচিত ছিল এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?

বাংলাদেশ সংকটের প্রেক্ষাপটে আর্টিকেল ২(৭) এবং ২(৪) নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা না করেই (যা আমি আমার দুজন সহকর্মীর সহযোগিতায় অধ্যয়ন করার প্রস্তাব করছি), এখানে কিছু অস্থায়ী উপসংহার তুলে ধরা হলো। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করার জন্য আর্টিকেল ২(৭)-কে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, এর অন্তত তিনটি কারণ রয়েছে-

১. পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় হওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।

২. ভারতের মাটিতে ১ কোটি শরণার্থীর উপস্থিতি, যার সাথে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্রোধ থেকে পালিয়ে আসছিল এবং এর ফলে ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর যে প্রভাব পড়েছিল, তা পরিস্থিতিকে ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিকীকরণ করেছিল।

৩. মানবাধিকারের ব্যাপক এবং ধারাবাহিক লঙ্ঘনের কারণে পরিস্থিতিটিকে আর অভ্যন্তরীণ বলে গণ্য করা যায় না।

আর্টিকেল ২(৪) হয়তো মৃত নয়, যেমনটি অধ্যাপক লুইস হেনকিন অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্কের উত্তরে জোর দিয়ে বলেছেন। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, নিম্নলিখিত কারণগুলোর জন্য বাংলাদেশ সংকট এটিকে মারাত্মকভাবে নাড়া দিয়েছে-

১. বাংলাদেশের জন্মের ত্বরান্বিতকরণে ভারতের দ্বারা আর্টিকেল ২(৪)-এর প্রযুক্তিগত লঙ্ঘন সত্ত্বেও, প্রতিষ্ঠার ৪ মাসের মধ্যে ৫০টিরও বেশি দেশ এটিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

২. বলপ্রয়োগের জন্য জাতিসংঘের কোনো প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ভারতকে নিন্দা বা এমনকি ভর্ৎসনা করা হয়নি।

৩. সাধারণ পরিষদে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির পক্ষে বিপুল ভোট সত্ত্বেও, সদস্য রাষ্ট্রগুলো ভারতের বলপ্রয়োগের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে বলে মনে হচ্ছিল।

সুপারিশের ব্যাপারে বলতে গেলে, পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে পরিস্থিতির গুরুত্ব এবং সম্ভাব্য হুমকির কারণে নিরাপত্তা পরিষদে এটি নিয়ে আলোচনা করা উচিত ছিল। নিরাপত্তা পরিষদের নিষ্ক্রিয়তার মুখে, মহাসচিবের উচিত ছিল জাতিসংঘের ফোরামে পরিস্থিতি তুলে ধরতে আর্টিকেল ৯৯-এর অধীনে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করা।

জাতিসংঘের মানবাধিকার মেকানিজমগুলোর সক্রিয় হওয়া উচিত ছিল। বিশেষ করে, সাব-কমিশন অন প্রিভেনশন অফ ডিসক্রিমিনেশন অ্যান্ড প্রোটেকশন অফ মাইনরিটিজ-এর পরিস্থিতিটি অধ্যয়ন করা উচিত ছিল। সাব-কমিশনের কাছে থাকা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যেসব পরিস্থিতি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিক প্যাটার্ন প্রকাশ করে, সেগুলো অধ্যয়ন করার ক্ষমতা এটিকে দেওয়া হয়েছে এবং সাব-কমিশনের কাছে এমন তথ্য উপলব্ধ ছিল।

যেহেতু এখন সাব-কমিশনকে প্রাথমিকভাবে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা প্রেরিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সম্বলিত যোগাযোগগুলো পর্যালোচনা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে (২৭ মে, ১৯৭০ সালের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের প্রস্তাব ১৫০৩ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুসারে), এই বিষয়ে সাব-কমিশনের একটি বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। সম্ভবত বিপুল মাত্রায় মানুষের জীবনের আসন্ন হুমকি বা ইচ্ছাকৃত ধ্বংসের কারণে যেসব পরিস্থিতিতে জরুরি এবং তাৎক্ষণিক মনোযোগের প্রয়োজন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য জরুরি অধিবেশনে বসার ক্ষমতা কমিশন অন হিউম্যান রাইটসকে দেওয়া উচিত, যে প্রস্তাবটি সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অফ জুরিস্টস করেছে। প্রস্তাবিত জাতিসংঘের হাই কমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস-এর অফিস একবার প্রতিষ্ঠিত হলে, প্রাথমিক কিছু তদন্ত করার এবং কমিশন অন হিউম্যান রাইটসের জন্য পদক্ষেপের সুপারিশ করার ক্ষমতা হয়তো সেই অফিসকে দেওয়া উচিত।

সব ধরনের বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ, যা বলবৎ রয়েছে এবং যার অধীনে বর্ণবৈষম্য বিষয়ক কমিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা প্রয়োগ করা উচিত ছিল। পাকিস্তান এই কনভেনশনের একটি পক্ষ এবং কমিটির একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকা উচিত ছিল।

মানবাধিকারের ব্যাপক লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে, তা ভবিষ্যতে এই ধরনের লঙ্ঘন জড়িত কোনো সংকটে জরুরি ভিত্তিতে এই ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করার জন্য আর কোনো প্রমাণ বা সাক্ষ্যের প্রয়োজন রাখে না। ডেনভার ল রিভিউ, ভলিউম ৪৯, ইস্যু ১, আর্টিকেল ৪, জানুয়ারি ১৯৭২

(লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিগ্যাল স্টাডিজ প্রোগ্রামের পরিচালক, ইউনিভার্সিটি অব ডেনভার কলেজ অব ল।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights