এক কমলাগাছ থেকে ফারুকের কৃষি সাম্রাজ্য
অনলাইন ডেস্ক
একটি কমলাগাছের ডাল থেকে শতাধিক চারা। সেই চারা দিয়ে বাণিজ্যিক বাগান। প্রথম বছরই কমলা বিক্রি করে আয় করেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এরপর কমলার সঙ্গে যুক্ত হয় আঙুর, মাল্টা, আম, ড্রাগনসহ নানা জাতের ফল। ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয় কৃষি উদ্যোগ।
এখন সাড়ে সাত একর জমিতে গড়ে উঠেছে সমন্বিত কৃষি খামার। শুধু ফল উৎপাদন নয়, নিজের বাগানের গাছ থেকে কলম করে চারা তৈরির মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন নার্সারিও। তার উৎপন্ন চারা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়, এমনকি ভারতেও। শখের বশে বাড়ির আঙিনায় লাগানো একটি কমলাগাছ থেকেই শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। কুড়িগ্রামের বেলগাছায় গড়ে ওঠা এই কৃষি উদ্যোগের নাম ‘কাজী এগ্রো ফুড রিসোর্ট অ্যান্ড ইকোপার্ক’।
খামারটির উদ্যোক্তা আবু রায়হান ফারুক। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের বাসিন্দা তিনি। তার বাবা কাজী মো. হাবিবুর রহমান। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে উদ্ভিদবিদ্যায় পড়াশোনা করেছেন ফারুক। পড়াশোনা শেষে চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকেই তিনি আত্মকর্মসংস্থানের পথ হিসেবে বেছে নেন।
একটি কমলাগাছ থেকেই শুরু : ২০১৮ সালে বগুড়ায় বেড়াতে গিয়ে একটি কমলার চারা কিনে আনেন ফারুক। বাড়ির উঠানে লাগানো সেই গাছে পরের বছর ফল ধরে। পরিবারের সদস্যরা কমলার স্বাদ ও মিষ্টতায় মুগ্ধ হয়। এরপর ওই গাছের ডাল কলম করে শতাধিক চারা তৈরি করেন তিনি। সেই সব চারা এক বিঘা জমিতে লাগিয়ে শুরু করেন বাণিজ্যিক চাষ। ২০১৯ সালে প্রথম ফলনেই প্রায় ৫০ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করেন।
সেই উদ্যোগ এখন অনেক বড় হয়েছে। বর্তমানে দুই বিঘা জমিতে তার শতাধিক কমলাগাছ রয়েছে। এ বছর প্রায় তিন লাখ টাকার কমলা বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি বিক্রি করেছেন প্রায় তিন লাখ টাকার কমলার চারা।
ফারুক বলেন, উদ্ভিদবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিতে আত্মকর্মসংস্থানের পথ বেছে নিয়েছেন। কৃষি তাকে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দিয়েছে।
ছাদবাগানের আঙুর থেকে তিন বিঘার বাণিজ্যিক বাগান: কমলার পর আঙুর চাষে আগ্রহী হন ফারুক। জেলার সীমান্তবর্তী ফুলবাড়ী উপজেলার এক ব্যাংক কর্মকর্তার বাড়ির ছাদবাগানে রাশিয়ান বাইকুনুর জাতের আঙুর দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়। ২০২১ সালে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আনা কয়েক জাতের প্রায় ২০০টি আঙুরের চারা দিয়ে এক বিঘা জমিতে বাণিজ্যিক চাষ শুরু করেন। এক বছর পর গাছে ফল আসে। এরপর নিজেই কলম পদ্ধতিতে চারা তৈরি করে আরো দুই বিঘা জমিতে আঙুরের চাষ সম্প্রসারণ করেন।
ফারুকের দাবি, তার আঙুরবাগান দেশের প্রথম বাণিজ্যিক আঙুরবাগান। বাগানে বিভিন্ন জাতের আঙুর উৎপাদনের পাশাপাশি চলছে চারা তৈরি ও বিক্রি। চাষ শুরুর পর এক বছরে প্রায় দুই লাখ টাকার আঙুর এবং সাত লাখ টাকার আঙুরের চারা বিক্রি করেন তিনি। এ বছর প্রায় তিন লাখ টাকার আঙুর ও ১০ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। জাত ও আকারভেদে এসব চারার দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।
একই খামারে নানা জাতের ফল : ফারুকের খামারে রয়েছে আলাদা আলাদা ফলের বাগান। পাশাপাশি একই জমিতে একাধিক ফসল চাষের ব্যবস্থাও রয়েছে। দুই বিঘা জমিতে আঙুর, দুই বিঘায় কমলা এবং দুই বিঘায় আমের বাগান করেছেন তিনি। এ ছাড়া একই জমিতে সুপারি, আম, মাল্টা, আপেল ও আঙুরের গাছ লাগিয়েছেন। আঙুরের মাচার নিচে চাষ করছেন আদা।
খামারে কাটিমন ও বারি-৪ জাতের প্রায় ৫০০টি আমগাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ টাকার আম বিক্রি করেন ফারুক। এ ছাড়া রয়েছে প্রায় চার হাজার সুপারিগাছ। সুপারি ও সুপারির চারা বিক্রি করে বছরে প্রায় এক লাখ টাকা আয় হয় বলে জানান তিনি।
৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগে কৃষি উদ্যোগ : একটি চারা দিয়ে শুরু হলেও খামারটি গড়ে তুলতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে ফারুককে। সাড়ে সাত একর জমি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। ফলে জমি কেনার খরচ না থাকলেও চারা সংগ্রহ, পরিচর্যা ও খামারের অন্যান্য অবকাঠামো ও কার্যক্রমে এই অর্থ ব্যয় করেছেন তিনি।
ফারুক জানান, শুরুতে ছোট পরিসরে চাষাবাদ করলেও ফলন ও চারা বিক্রির অভিজ্ঞতা তাকে বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত করেছে। এখন ফল বিক্রির পাশাপাশি নার্সারি থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হচ্ছে।
বাগানের চারা যাচ্ছে বিভিন্ন জেলায় : ফারুকের কৃষি উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নার্সারি। প্রায় দুই বিঘা জমিতে গড়ে তোলা এই নার্সারিতে নিজের বাগানের ভালো ফলনশীল গাছ থেকে ডাল সংগ্রহ করে কলম পদ্ধতিতে নতুন চারা তৈরি করা হয়। এসব চারা কিনতে কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার নার্সারি মালিক ও চাষিরা তার খামারে আসেন।
নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ ইউনিয়নের আরিফ নার্সারির স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূর থেকে ফারুকের খামারে এসেছিলেন কমলা ও মাল্টার ডাল সংগ্রহ করতে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ফারুকের কমলার আকার বড় এবং স্বাদও ভালো। তাই দূর থেকে এসে ডাল নিয়ে চারা তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন তিনি। ভালো বাগানের চারা থেকে মানুষ ভালো ফলন পেলে নার্সারিরও সুনাম হয়।
প্রতিকূল আবহাওয়া ও ইটভাটার ধোঁয়ায় ক্ষতি : কৃষিতে সাফল্য এলেও নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হচ্ছে ফারুককে। কুড়িগ্রাম নদ-নদীপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এখানকার আবহাওয়া ফল চাষের জন্য সব সময় অনুকূল নয়। বর্ষায় অতিবৃষ্টি এবং শীতকালে তীব্র ঠাণ্ডায় ফলদ গাছের বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খামারের পাশের দুটি ইটভাটার প্রভাব।
ফারুক জানান, ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও তাপের কারণে অনেক সময় গাছ ও ফল শুকিয়ে যায়। পরিপক্ব হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে ফল। এতে ফলন কমার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও তৈরি হয়। এসব প্রতিকূলতা সামলে খামারের উৎপাদন ধরে রাখতে হচ্ছে তাঁকে।
কৃষিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ
ফারুকের খামারে নিয়মিত কাজ করেন ছয়জন শ্রমিক। কাজের চাপ অনুযায়ী খণ্ডকালীন শ্রমিকও নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের একজন ৫৫ বছর বয়সী আবদুর রহিম। একসময় দৈনিক মজুরিতে কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। এখন এই খামারে মাসিক বেতনে কাজ করছেন।
আবদুর রহিম বলেন, আগে কাজ না থাকলে খাবার নিয়ে চিন্তা হতো। এখন মাসিক বেতন পান। তাই সংসার চালানো নিয়ে আগের মতো দুশ্চিন্তা করতে হয় না।
ফারুকের মতে, দেশে কমলার চাহিদার বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা ফল দিয়ে পূরণ করতে হয়। বাণিজ্যিকভাবে দেশে কমলার চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদেশে ফল রপ্তানিরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. নাহিদা আফরীন বলেন, আবু রায়হান ফারুক যখন কমলা ও মাল্টার বাগান শুরু করেন, তখন থেকেই কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত তাঁর বাগান পরিদর্শন করেন এবং গাছের পরিচর্যা ও চাষাবাদ বিষয়ে পরামর্শ দেন।
তিনি আরো বলেন, কুড়িগ্রামের মাটিতে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর ও কমলার চাষ হচ্ছে। ফারুক পরীক্ষামূলকভাবে বাগান করে সফলতা পেয়েছেন। কেউ এ ধরনের কৃষি খামার গড়ে তুলতে চাইলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।
