চ্যালেঞ্জ থাকলেও সম্প্রসারণমূলক বাজেটই প্রয়োজন

নিরঞ্জন রায়

আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষণার সময় একেবারেই সন্নিকটে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে বাজেট প্রস্তুতির কাজ নিশ্চয়ই বেশ জোরেশোরে এগিয়ে চলেছে।

প্রাক-বাজেট আলোচনাও প্রায় শেষের দিকে, যদিও এখনো বাজেট নিয়ে আলোচনা এবং লেখালেখি অব্যাহত আছে। এবারের বাজেটে কিছু বিশেষত্ব আছে।

প্রথমত, দীর্ঘ দুই বছর পর আবার মহান জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ হবে, আলোচনা হবে এবং সেই বাজেট পাসও হবে। আগের অর্থবছরের বাজেটে এই স্বাভাবিক পদ্ধতি অনুপস্থিত ছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে মনে করেছে, সেভাবেই বাজেট তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচিত বর্তমান সরকারের জন্য এটি হবে প্রথম বাজেট। তা ছাড়া এবার হবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের বাজেট।

কেননা দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে অর্থনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, সেটি বিবেচনায় নিয়ে বাজেট প্রস্তুত করা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রথম চ্যালেঞ্জটি আসবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে। এই সময়ে দেশের অর্থনীতি একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দেশের জিডিপি ৬ শতাংশের ওপর থেকে ৩ শতাংশের কাছে চলে এসেছে।

জিডিপির এমন ধস এর আগে কখনো হয়েছে কি না আমার জানা নেই। এই জিডিপি টেনে তোলা মোটেই সহজ কাজ নয়। বিগত দেড় বছরে সরকারি খাত যেমন বাধাগ্রস্ত হয়েছে, বেসরকারি খাতও তেমনি মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দুই খাতে গতি সঞ্চার করার জন্য যে মাত্রার ফিসক্যাল পলিসি সহায়তা প্রয়োজন, তা এই বাজেটে নিশ্চিত করা একেবারেই দুরূহ কাজ। আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে গেলে কর বাড়াতে হবে, যা জনগণ এবং দেশের ব্যবসায়ীদের আরো বেশি আর্থিক সংকটে ফেলে দেবে।

এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। তাই তাদের ওপর করের বোঝা বৃদ্ধি করার সুযোগ নেই। ব্যবসায়ীদের অবস্থা আরো বেশি সংকটাপন্ন। প্রথমত, বেশির ভাগ ব্যবসায়ীর ক্রয়-বিক্রয় যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে এবং এর প্রভাবে মুনাফাও হ্রাস পেয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরকারের কর আদায়ের পরিমাণও কমে গেছে। আগে যে ব্যবসায়ীর বার্ষিক মুনাফা ছিল দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা, তিনি সরকারকে কর প্রদান করতেন এক কোটি টাকা। এখন সেই ব্যবসায়ীর মুনাফা যদি হ্রাস পেয়ে দুই কোটিতে নেমে আসে, তাহলে তিনি সরকারকে কর পরিশোধ করবেন ৮০ লাখ টাকা। একইভাবে আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় আমদানি শুল্ক আদায়ের পরিমাণও অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। এককথায় সরকারের রাজস্ব আদায়ের যতগুলো পথ খোলা আছে, সব ক্ষেত্রেই নিম্নগামী অবস্থা। ফলে সরকার কিভাবে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করবে, সেটি এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সমস্যা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, যার কারণে জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন এবং জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। এই জ্বালানিসংকট এবং জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেকেই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা করছেন।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই যুদ্ধ শিগগিরই বন্ধ না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক মন্দা অবশ্যম্ভাবী। আর যদি তেমনটি হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরো চাপে পড়ে যাবে। যদি যুদ্ধ বন্ধ হয়ও, তাহলেও শিগগিরই যে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে, তেমনটি ভাবার কারণ নেই। যুদ্ধ বন্ধ হলে বিশ্বব্যাপী মন্দা হয়তো এড়ানো যাবে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্য দিয়েই যাবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি বেশি জটিল হওয়ার আশঙ্কা আছে। কেননা অন্যান্য দেশের কিছুটা হলেও প্রস্তুতি আছে। আমাদের দেশের তো কোনো রকম প্রস্তুতি নেই, উল্টো অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে সৃষ্ট ভয়াবহ সংকট বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হয়ে আছে। এর বাইরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে আমেরিকায় প্রাইভেট ক্রেডিটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিশৃঙ্খল অবস্থা ২০০৮ সালের সাবপ্রাইম মর্টগেজ কেলেঙ্কারির মতো এক আর্থিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পারলেও আমেরিকায় বিষয়টি নিয়ে বেশ জোরেশোরেই আলোচনা হচ্ছে। যদি প্রাইভেট ক্রেডিট সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান না হয় এবং এ কারণে আমেরিকায় আর্থিক সংকট দেখা দেয়, তাহলে এর প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পড়বে এবং বাদ যাবে না আমাদের দেশও। তাই বাজেট তৈরির সময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে সংকট আছে বা আরো সংকট দেখা দিতে পারে, সেই বিষয়গুলো সক্রিয় বিবেচনায় নিতে হবে।

যা হোক, সমস্যার কথা বলে তো আর শেষ করা যাবে না। দেশের ভেতরে-বাইরে সর্বত্রই শুধু সমস্যা, যার সঠিক সমাধান খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন এই সমস্যার মধ্যে থেকেই চলতে হবে এবং এগিয়ে যেতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের দেশে সব সময়ই বাজেট প্রণয়ন চ্যালেঞ্জের। কিন্তু এ বছর এই চ্যালেঞ্জের মাত্রা অনেক বেশি। আর চ্যালেঞ্জ সামনে রেখেই সরকারের বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। ব্যয় সংকোচন করতে হবে এবং সেই সঙ্গে অপরিহার্য নয় এমন কিছু ব্যয় পরিহার বা স্থগিত করা যেতে পারে। কর বৃদ্ধির অবকাশ নেই বললেই চলে, উল্টো রাজস্ব হ্রাস পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। ফলে রাজস্ব ঘাটতি অবশ্যম্ভাবী।

আমাদের দেশে সাধারণত ঘাটতি বাজেটই প্রণীত হয়। অবশ্য ঘাটতি বাজেট কোনো সমস্যা নয়, যদি ঘাটতির অর্থ সঠিকভাবে সংগ্রহ করা যায়। তবে রাজস্ব বাজেটের ঘাটতি ভালো লক্ষণ নয়। অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়ন করলে এ বছর রাজস্ব বাজেটেও ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা ব্যতিক্রম হিসেবে নিয়ে রাজস্ব বাজেটে অর্থায়নের জন্য সরকার ব্যাংকঋণের পরিবর্তে কর বা রাজস্ব বন্ড ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। দু-এক বছর পর যখন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরবে, তখন যে রাজস্ব আদায় হবে, তা দিয়ে এই বন্ডের অর্থ পরিশোধ করা যাবে।

কিছু বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন আছে। সরকারের কাছে থাকতে হবে বৈদেশিক মুদ্রাসহ অর্থের প্রকৃত অবস্থান। কেননা বাজেটের সঙ্গে অর্থের জোগানের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা এবং দেশীয় মুদ্রার তহবিলের বিষয়টি সেভাবে জানানো হয়নি। এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করে জিডিপি ও অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রকৃত অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে সরকার ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে যথেষ্ট সম্প্রসারণমূলক বাজেটই প্রণয়ন করা সম্ভব। তবে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে হবে। আর দেশীয় মুদ্রায় যে ঘাটতি থাকবে, সেটি ব্যাংকঋণের পরিবর্তে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সংগ্রহ করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হবে। কেননা এতে দুটি লাভ হবে। প্রথমত, সরকার তুলনামূলক অল্প সুদে এই অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সুবিধা সংকুচিত হবে না। দেশে সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট থাকলে কাজটি অনেক সহজ হতো। তাই এখন বিকল্প পদ্ধতিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই বন্ড বিক্রি করা যেতে পারে এবং এর পাশাপাশি দেশে সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দেওয়া প্রয়োজন।

সরকারি দল হিসেবে বিএনপি প্রায় দুই দশক পরে জাতীয় বাজেট পেশ করতে চলেছে। সর্বশেষ এই দল যখন বাজেট পেশ করেছিল, তখন দেশের অর্থনীতির আকার ছিল ৮০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মতো। দুই দশক পরে এসে এই দল যখন আবার বাজেট পেশ করতে চলেছে, তখন দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় অর্ধট্রিলিয়ন ডলারের মতো। শুধু তা-ই নয়, এখন সরকার যখন বাজেট পেশ করবে, তখন জাতির সামনে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছার সম্ভাবনা। সুতরাং নতুন সরকারকে যে বেশ ভেবেচিন্তে এবং পরিকল্পনা করে তাদের প্রথম বাজেট প্রস্তুত করতে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সঠিক কিছু পদক্ষেপ নিতে পারলে এই চ্যালেঞ্জ এবং সংকটের মধ্যেও অর্থনৈতিতে গতি সঞ্চার করার মতো সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়ন করা অসম্ভব নয়। আমাদের ধারণা, সরকার হয়তো সে পথেই হাঁটবে।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights