জার্মানির সাবেক গোয়েন্দা প্রধান গ্রেফতার, যুক্তরাজ্য ভয় পাচ্ছে কেন?

অনলাইন ডেস্ক

জার্মানির আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গোয়েন্দা কেলেঙ্কারির ঘটনায় যুক্তরাজ্যের গোপন তথ্য ও গোয়েন্দা এজেন্টদের তথ্য ফাঁস হয়ে গেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। জার্মানির পররাষ্ট্র বিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডি-এর সাবেক প্রধান অগাস্ট হ্যানিং এবং সংস্থাটির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ‘ম্যানফ্রেড ডি’ গ্রেফতার হওয়ার পর এই বড় ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গুপ্তচরবৃত্তি ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, অগাস্ট হ্যানিং দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ম্যানফ্রেড ডি-এর মাধ্যমে বেআইনিভাবে বিএনডি-এর শ্রেণিবদ্ধ বা অত্যন্ত গোপন নথিপত্র সংগ্রহ করে আসছিলেন এবং এর কিছু অংশ একটি বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে বিক্রিও করেছেন। জার্মান নিরাপত্তা সংস্থাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া দুজন যেসব উচ্চপর্যায়ের স্পর্শকাতর তথ্য লেনদেন করেছেন, তার কিছু অংশ এসেছে বিদেশি মিত্র গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে। এর ফলে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য হাতবদল হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কর্মরত মার্কিন ও ব্রিটিশ গোপন এজেন্ট বা তথ্যদাতাদের পরিচয় ফাঁস হওয়ারও ভয় তৈরি হয়েছে।

হঠাৎ এই কেলেঙ্কারির ঘটনায় পশ্চিমা গোয়েন্দা গোষ্ঠী গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এই তথ্য ফাঁস হওয়াকে শত্রুভাবাপন্ন বা বিদেশি কোনো শক্তির বড় ধরনের সাফল্য এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোটের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে বর্ণনা করেছে। জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের এমআইসিক্স এবং জিসিএইচকিউ-সহ বেশ কয়েকটি মার্কিন সংস্থা এখন ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে সম্পর্কিত সময়ে শেয়ার করা সমস্ত স্পর্শকাতর তথ্যের একটি নিখুঁত অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা চালাচ্ছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো এই ফাঁসের কারণে বিপদে পড়তে পারে এমন মানবসম্পদ ও এজেন্টদের রক্ষা করা। জার্মানির অন্যান্য গোয়েন্দা অংশীদার দেশগুলোও একই ধরণের অডিট কার্যক্রম শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জার্মান কর্মকর্তারা গ্রেফতার করার আগে ঠিক কখন তাঁদের মিত্রদের এই নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়ে অবহিত করেছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে গ্রেফতারের আগেই মিত্রদের বিষয়টি জানানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। জার্মান গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, রাশিয়ার সামরিক বাহিনী এবং বিদেশি অংশীদার সংস্থাগুলোর শ্রেণিবদ্ধ নথিপত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জার্মানির বিএনডি-এর প্রধান হিসেবে ছয় বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০০৫ সালের নভেম্বরে অবসরে যান অগাস্ট হ্যানিং। পরবর্তী সময়ে তিনি মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েন এবং দেউলিয়া হওয়ার মুখোমুখি হন। অন্যদিকে, তাঁর তৎকালীন চিফ অফ স্টাফ ম্যানফ্রেড ডি পরবর্তীতে হ্যানিংয়ের সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও কাজ করেন। পরবর্তীতে মার্চ ২০১২ থেকে এই বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত একাধিক বিএনডি সভাপতির চিফ অফ স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এই পদে থাকার সুবাদে বিএনডি সভাপতির দপ্তরে তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং কোন গোয়েন্দা তথ্য কখন দেওয়া হবে তা নির্ধারণে তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থাই নিজস্ব তথ্য গোপন রাখার কৌশল হিসেবে নির্দিষ্ট সীমারেখা বজায় রাখে, তবে অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে ম্যানফ্রেড ডি-এর কাছে বিএনডি-এর পাওয়া প্রায় সমস্ত গোয়েন্দা তথ্যে পৌঁছানোর ব্যাপক সুযোগ ছিল। জার্মানির ফেডারেল প্রসিকিউটর অফিস জানিয়েছে, ম্যানফ্রেড ডি সাবেক প্রধান হ্যানিংকে প্রায় দুই হাজার নথিপত্র সরবরাহ করেছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ২০১০ সালের বসন্তে এই দুজন আর্থিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন, যার আওতায় ম্যানফ্রেড ডি নিয়মিতভাবে তার সাবেক প্রধানকে অর্থের বিনিময়ে বিএনডি-এর মূল্যবান গোয়েন্দা তথ্য পাঠাতেন। প্রসিকিউটরদের মতে, লেনদেন করা অনেক নথিতে অত্যন্ত গোপন তথ্য ছিল, যা কেবল অভ্যন্তরীণ কাজের জন্য এবং বিশেষভাবে শীর্ষ নির্বাহীদের দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

অগাস্ট হ্যানিং তার ব্যক্তিগত পরামর্শক বা কনসাল্টিং কাজের জন্য এসব তথ্য ব্যবহার করতেন বলে জানিয়েছে প্রসিকিউটর অফিস। তারা জানায়, অন্তত একটি ঘটনায় হ্যানিং ম্যানফ্রেড ডি-এর কাছ থেকে পাওয়া শ্রেণিবদ্ধ গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে কোনো এক বিদেশি গোয়েন্দা কর্মকর্তার জন্য একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। তবে সেই নথিপত্র শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত প্রাপকের কাছে পৌঁছেছিল কি না, তা এখনও তদন্তাধীন। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডার স্পিগেল জানিয়েছে, ওই বিশ্লেষণটি আজারবাইজানের গোয়েন্দা সংস্থার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

অথচ সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনায় হ্যানিং মস্কোর বিরুদ্ধে বেশ কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জার্মানিকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন যে, দেশটি অত্যন্ত অবাস্তব বা সরল এবং একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের বাস্তবতায় সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেছিলেন, অনেকেই বুঝতে পারছে না যে রাশিয়া সঙ্গে ইতিমধ্যেই একটি সংঘাতের মধ্যে রয়েছে এবং এটিকে খাটো করে দেখা হচ্ছে। মানুষ সত্য এড়িয়ে যাচ্ছে, কারণ রাশিয়া ন্যাটোর সাথে দ্বন্দ্বে রয়েছে এবং জার্মানি নিশ্চিতভাবেই সেই সংঘাতের অংশ। বিশেষ করে পূর্ব জার্মানি এবং চরম বাম ও চরম ডানপন্থীদের মধ্যে রাশিয়ার প্রতি সহানুভূতি রয়েছে, যারা মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ইনসাইডারের তথ্য অনুযায়ী, বিএনডি ছাড়ার পর হ্যানিং অন্তত সাতবার রাশিয়া সফর করেছিলেন। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে করা এসব সফরের সময় তিনি অনেক সময় মাত্র এক দিন করে মস্কোতে অবস্থান করতেন।

সংস্থাটির বর্তমান সভাপতি মার্টিন ইয়েগার জানিয়েছেন, বিএনডি শুরুতেই অত্যন্ত দ্রুত অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করে এবং এতে প্রাথমিক সন্দেহের সত্যতা পাওয়া যায়। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিএনডি কোনো আপস করবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ঘটনার কারণে তাঁর কোনো লক্ষ্য বা অগ্রাধিকার ব্যাহত হবে না।

এমআইসিক্স-এর সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ম্যাথিউ ডান জানান, ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিএনডি-এর সাথে শেয়ার করা সমস্ত তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করছে এবং এতে কী পরিমাণ ঝুঁকি তৈরি হতে পারে তা খতিয়ে দেখছে। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একটি অংশীদার সংস্থার সাথে তথ্য শেয়ার করার পর এমন ঘটনা এমআইসিক্স-এর ভেতরে একটি ব্যাপক পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, যাতে বোঝা যায় যে এর ফলে কোনো কার্যক্রম বা এজেন্টদের তথ্য উন্মোচিত হয়েছে কি না। তবে এই ঘটনায় বিএনডি-এর সাথে সুসম্পর্কে কোনো চির ধরবে না বলেই তিনি মনে করেন এবং এই দুই সংস্থা যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি আরও জানান, কোনো গোয়েন্দা তথ্য যখন অন্য দেশকে দেওয়া হয়, তখন তথ্যের উৎস এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে গোপন বা পরিমার্জন করার নিয়ম প্রচলিত রয়েছে।

সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights