ডিজিটাল ব্যাংকে হবে শাখা ছাড়া ব্যাংকিং

ব্যাংকের শাখায় না গিয়েই হিসাব খোলা, টাকা জমা-উত্তোলন, ঋণের আবেদন, বিল পরিশোধ ও অর্থ স্থানান্তর-এমন ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার যখন দ্রুত বাড়ছে, তখন শাখাহীন পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক চালুর প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বৃহস্পতিবার পাঁচটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংককে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নতুন এই উদ্যোগের ফলে ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা ও সেবার ধরনে পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্যাংকিংয়ের বাইরে থাকা বা কম সেবা পাওয়া জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এলওআই পাওয়া মানেই চূড়ান্ত ব্যাংক লাইসেন্স নয়। অবকাঠামো, প্রযুক্তি, মূলধনসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত পূরণের পর চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, ডিকে ডিজিটাল ব্যাংক, নোভা ডিজিটাল ব্যাংক, বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩ সালের নীতিমালা অনুযায়ী, একটি ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন হতে হবে ৩০০ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের কোনো শাখা, উপশাখা বা কাউন্টার থাকবে না। ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। অর্থাৎ গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের প্রধান যোগাযোগ হবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে।

ডিজিটাল ব্যাংক কীভাবে কাজ করবে : প্রচলিত ব্যাংকে হিসাব খোলার জন্য গ্রাহককে শাখায় যেতে হলেও ডিজিটাল ব্যাংকে মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করে হিসাব খোলার ব্যবস্থা থাকবে। এরপর টাকা স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, সঞ্চয়, কার্ড বা কিউআর পেমেন্ট, ঋণের আবেদনসহ বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নেওয়া যাবে।

ডিজিটাল ব্যাংকের বড় পরিবর্তন আসতে পারে ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়ায়। গ্রাহকের লেনদেনের তথ্য, আয়-ব্যয়ের ধরন ও অন্যান্য অনুমোদিত ডেটা বিশ্লেষণ করে প্রযুক্তিনির্ভরভাবে ঋণঝুঁকি মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে। ফলে প্রচলিত ব্যাংকের শাখাভিত্তিক মূল্যায়নের বাইরে ছোট উদ্যোক্তা ও কম ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া গ্রাহকের জন্য নতুন ধরনের ঋণসেবা তৈরির সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ডিজিটাল ব্যাংক চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ছোট উদ্যোক্তা ও কম সেবা পাওয়া জনগোষ্ঠীর কাছে সাশ্রয়ী ব্যাংকিং পৌঁছে দেওয়া এবং ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ানো।

ডিজিটাল ব্যাংক এখনো চালু হয়নি। কিন্তু প্রচলিত ব্যাংকের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের চিত্র বলছে, গ্রাহকের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে শাখার বাইরে ব্যাংকিংয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে দেশে ইন্টারনেট ব্যাংকিং গ্রাহক ছিল ২ কোটি ২৭ লাখ। মে মাসে এ সংখ্যা ছিল ২ কোটি ২৮ লাখ। জুনে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা, যা মে মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। ওই সময়ে ৫৮টি তফসিলি ব্যাংক ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছিল।

জুনে ইন্টারনেট ব্যাংকিং গ্রাহকদের মধ্যে পুরুষ ছিলেন ১ কোটি ৭৮ লাখ, নারী ৪৪ লাখ এবং ‘অন্যান্য’ শ্রেণিতে ছিলেন ৪ দশমিক ৭ লাখ। লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে আরটিজিএসে ৫০ হাজার ৪৬১ কোটি, এনপিএসবিতে ৫৭ হাজার ৪৮০ কোটি এবং বিইএফটিএনে ১১ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।

শুধু ইন্টারনেট ব্যাংকিং নয়, ব্যাংকের নিজস্ব অ্যাপও দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। যেমন- ব্র্যাক ব্যাংকের আস্থা অ্যাপের ব্যবহারকারী ২০২৫ সালের শেষে ১১ লাখের বেশি ছিল এবং মাসে লেনদেন হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। অ্যাপটিতে আন্তব্যাংক অর্থ স্থানান্তর, ডিপিএস ও মেয়াদি আমানত, ঋণ, বাংলাকিউআর, কার্ডবিহীন এটিএম উত্তোলন ও বিকাশ সংযোগসহ ১২০টির বেশি ফিচার রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানেও ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের চিত্র রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ড, কিউআর, এমএফএস ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক ও লেনদেনের তথ্য প্রকাশ করছে।

গ্রাহকের কী লাভ : ডিজিটাল ব্যাংকের ফলে ব্যাংকিংয়ের জন্য শাখায় যাওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমতে পারে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার গ্রাহক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তরুণ ও অনলাইননির্ভর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মোবাইল ফোন থেকেই ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

শাখা ও ভৌত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কম থাকায় ডিজিটাল ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ও কম হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর প্রভাব সেবার মূল্য, হিসাব পরিচালনা ও অর্থ স্থানান্তরের খরচে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দ্রুত হিসাব খোলা ও ঋণের আবেদন, স্বয়ংক্রিয় সঞ্চয়, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে শাখাহীন ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে নতুন ঝুঁকিও আসবে। সাইবার হামলা, তথ্য চুরি, ডিজিটাল প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি ও গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে ডিজিটাল ব্যাংকের সাফল্য শুধু দ্রুত গ্রাহক বাড়ানোর ওপর নয়, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সেবা দেওয়ার সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশের প্রচলিত ব্যাংকগুলোও অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কিউআর ও কার্ডভিত্তিক সেবা বাড়াচ্ছে। ফলে নতুন ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর সামনে শুধু ব্যাংকবহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করার কাজই নয়, বিদ্যমান ব্যাংকের ডিজিটাল সেবার সঙ্গে প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জও থাকবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights