তাজমিন হত্যার বিচার কত দিনে, নাকি বছরের পর বছর ঘুরবে আদালতের দরজায়?

নুরনবী মিয়া

একটি ১৫ বছরের কিশোরী রাতের আঁধারে বাড়ি ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠেছিল। হয়তো তার মনে ছিল নিরাপদে বাড়ি ফেরার স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লার জান্নাতুল তাজমিনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সিএনজিচালক সুমন মিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। ১০ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় পুলিশ। সূত্র: বাসস, ১০ অক্টোবর ২০২৬

এই সংবাদ পড়ার পর একজন বিবেকবান মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। যে বয়সে একটি মেয়ের বই হাতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সে তাকে এমন নৃশংসতার শিকার হতে হলো কেন? একটি শিশু কেন নিরাপদে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা পাবে না? একজন অভিভাবক কেন সন্তানকে বাইরে পাঠিয়ে এই দুশ্চিন্তায় থাকবেন যে সে সুস্থ শরীরে ঘরে ফিরবে কি না? রাষ্ট্রের কাছে এসব প্রশ্নের জবাব চাইতেই হবে।

কিন্তু তাজমিনের হত্যাকাণ্ডের পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। অপরাধের তদন্তে যখন এত দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব, তখন বিচার শেষ করতে বছরের পর বছর লাগবে কেন? যে মামলায় পুলিশ দ্রুত সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করতে পারে, গ্রেপ্তার করতে পারে, জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় এবং আলামত উদ্ধার করে, সেই মামলার বিচার শেষ করতে অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে হবে কেন? তদন্তের অগ্রগতি যদি দ্রুত হতে পারে, বিচারপ্রক্রিয়াও কেন দ্রুত ও কার্যকর হবে না?

আমি ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়াকে অপরাধ দমনের একমাত্র কিংবা সর্বোত্তম উপায় বলে আমি মনে করি না। কিন্তু তাজমিনের মতো শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংস অপরাধ আমাদের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে। আইন যদি অপরাধীকে সময়মতো শাস্তি দিতে না পারে, বিচার যদি দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে থাকে, আর অপরাধীরা যদি মনে করে অর্থ, প্রভাব কিংবা আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে বছরের পর বছর পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কীভাবে টিকে থাকবে?

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি এবং আসামির দেওয়া তথ্যে আলামত উদ্ধার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো আদালতে আইনসম্মতভাবে যাচাই করে অপরাধ প্রমাণের বিকল্প নয়। স্বীকারোক্তির গ্রহণযোগ্যতা, অন্যান্য আলামত, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং আসামিপক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করেই আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, দ্রুত বিচারের নামে ভুল ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ন্যায়বিচারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের দাবি হতে হবে, বিচার দ্রুত হোক, কিন্তু তা হোক নির্ভুল ও ন্যায়সংগত।

প্রশ্ন হচ্ছে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের হাতে কি প্রয়োজনীয় আইন নেই? গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং রায় ঘোষণার প্রতিটি পর্যায়ে অযৌক্তিক বিলম্ব বন্ধ করা যায় না? সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থতা, তদন্তে গাফিলতি, বারবার সময় নেওয়া কিংবা বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করার প্রবণতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না? অবশ্যই যায়। প্রয়োজন সদিচ্ছা, জবাবদিহি এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ।

বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনেও ধর্ষণের ফলে মৃত্যু ঘটানোর মতো গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি থাকা আর বাস্তবে দ্রুত ও নিশ্চিত বিচার প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর গ্রেপ্তার, মামলা, তদন্ত, বিচার, রায় এবং রায় কার্যকরের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান থাকলে শাস্তির ভয় কতটা কার্যকর থাকবে, সেই প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকেও তাকানো যাক। গত ৮ ও ৯ অক্টোবর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির প্রতিরক্ষা দপ্তর ২০০৯ সালে ফোর্ট হুডে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত নিডাল মালিক হাসানের মৃত্যুদণ্ড ৩ ডিসেম্বর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকরের পরিকল্পনা জানিয়েছে। সেই মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে ৯ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি নিয়ে তাঁর আপত্তি নেই, কিন্তু সরাসরি সম্প্রচারের বিষয়ে তিনি তখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। অর্থাৎ, প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড সম্প্রচারের বিষয়টি নিয়ে সেখানে বিতর্ক চলছে, আর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত তারিখও ঘোষণা করা হয়েছে। সূত্র: এএফপি ও দ্য গার্ডিয়ান, ৯ অক্টোবর ২০২৬

কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, কোনো দেশের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেই সেই ব্যবস্থার প্রতিটি দিক অনুসরণযোগ্য হয়ে যায় না। মৃত্যুদণ্ডকে প্রদর্শনীতে পরিণত করা কিংবা মানুষের সামনে একজনের মৃত্যু দেখিয়ে অপরাধ দমনের চেষ্টা সভ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না। আমাদের প্রয়োজন অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। প্রতিশোধের উন্মাদনা নয়, নিশ্চিত ন্যায়বিচারই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য।

তাহলে তাজমিনের ক্ষেত্রে আমাদের দাবি কী হওয়া উচিত? আমার দাবি, এই মামলার তদন্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেষ করতে হবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলামত যেন বাদ না পড়ে, অন্য কেউ জড়িত থাকলে যেন পার পেয়ে না যায় এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পাওয়া প্রতিটি প্রমাণ যেন যথাযথভাবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এরপর আইন অনুযায়ী দ্রুত বিচার শেষ করতে হবে। অযথা সময়ক্ষেপণ হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মামলাটি আলোচনার বাইরে চলে যাওয়ার পর যেন ফাইলের স্তূপে হারিয়ে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

আমি মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী হয়েও বলছি, অপরাধের বিচার নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো ধরনের শিথিলতা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এক সপ্তাহের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করার দাবি আইনি বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। মৃত্যুদণ্ডের রায়, আপিলের অধিকার, উচ্চ আদালতের পর্যালোচনা এবং আইন নির্ধারিত অন্যান্য ধাপ অতিক্রম না করে কাউকে ফাঁসি দেওয়া যায় না। এই প্রক্রিয়াগুলো কোনো অপরাধীকে অযথা সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়, বরং নির্দোষ ব্যক্তির জীবন রক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য।

কিন্তু আইনগত সুরক্ষার নামে বছরের পর বছর বিচার ঝুলিয়ে রাখারও কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের সময়সীমা ও অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে। তদন্তকারী সংস্থা, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট আদালতকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাসময়ে পালন করতে হবে। কোথাও গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধীর অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি নিহত শিশুটির পরিবারও যেন বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটিও রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা প্রায়ই শুনি, অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কেবল কঠোর রায়ের নাম নয়। সময়মতো বিচার হওয়া, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি কার্যকর হওয়া এবং অপরাধী যে যত প্রভাবশালীই হোক, আইনের হাত থেকে রেহাই না পাওয়াই হলো দৃষ্টান্ত স্থাপন। বিচার নিশ্চিত না করে শুধু সর্বোচ্চ শাস্তির ঘোষণা দিলে অপরাধ দমনের মূল সমস্যার সমাধান হবে না।

তাজমিনের মৃত্যু আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু কয়েক দিন পর এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা থেমে গেলে, আরেকটি ঘটনা সামনে এলে আমরা আগের ঘটনাটি ভুলে গেলে, তাহলে এই ক্ষোভের কোনো মূল্য থাকবে না। তাজমিনের পরিবার যেন বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরে ক্লান্ত হয়ে না পড়ে, সাক্ষীরা যেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে সরে না যান এবং প্রমাণ যেন অবহেলায় নষ্ট না হয়, সেই নিশ্চয়তা চাই।

রাষ্ট্রের কাছে আমাদের প্রশ্ন সরাসরি। অপরাধের বিচার যদি দ্রুত করার সক্ষমতা থাকে, তাহলে তা প্রয়োগ করা হবে না কেন? গুরুতর অপরাধের মামলায় অযৌক্তিক বিলম্বের দায় কারা নেবেন? ভুক্তভোগীর পরিবারকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে বাধ্য করার জন্য কারও জবাবদিহি থাকবে না কেন?

তাজমিনের জন্য বিচার চাই। শুধু তাজমিনের জন্য নয়, প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তার জন্য, প্রতিটি পরিবারের নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য এবং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বিচার চাই। অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে সর্বোচ্চ আইনসম্মত শাস্তি দিতে হবে। কোনো প্রভাব, কোনো অর্থ, কোনো কৌশল যেন ন্যায়বিচারকে আটকে রাখতে না পারে।

আমরা মৃত্যুদণ্ডের নামে তাড়াহুড়ো করে বিচার চাই না। আমরা চাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নিশ্চিত বিচার। কারণ, বিচারহীনতা অপরাধীকে সাহসী করে, আর ন্যায়বিচারের বিলম্ব সাধারণ মানুষকে অসহায় করে তোলে। তাজমিনের মৃত্যুর পর রাষ্ট্র যদি আবারও দীর্ঘসূত্রতার পুরোনো চক্রে আটকে যায়, তাহলে মানুষের ক্ষোভের জবাব দেওয়ার মতো কিছুই তার হাতে থাকবে না।

তাজমিনের জন্য বিচার চাই, এখনই। আইনের সীমার মধ্যে যত দ্রুত সম্ভব। কোনো অজুহাত নয়, কোনো অবহেলা নয়, কোনো প্রভাবশালীর জন্য বিশেষ সুবিধা নয়। অপরাধের বিচার হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি কার্যকর হবে এবং সেই বিচার দৃশ্যমান হবে। এটাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব, এটাই ন্যায়বিচারের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights