তিনগুণ রোগীতে বিঘ্নিত সেবা

মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতাল ৫০০ শয্যার। অথচ এ হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি থাকছেন ধারণক্ষমতার তিনগুণ রোগী। এতে ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা ও করিডরে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। হাসপাতাল ও রোগীদের সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাজারো মানুষ উন্নত চিকিৎসার আশায় প্রতিদিন এ হাসপাতালে আসেন। তাদের অনেকে আর্থিকভাবে অসচ্ছল। কিন্তু হাসপাতালে প্রবেশের পর থেকেই অনেককে পড়তে হয় নানা অনিয়ম ও হয়রানির মুখে। বহির্বিভাগে টিকিট সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরীক্ষা ও ভর্তি-প্রতিটি ধাপেই রয়েছে দালালদের তৎপরতার অভিযোগ। দালালরা ভালো চিকিৎসার কথা বলে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সালে ২৫০ শয্যা নিয়ে কুমেক হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। পরে রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় ২০০৮ সালে হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে শয্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় জনবল বাড়েনি। বর্তমানে কুমিল্লার ১৮টি উপজেলা ছাড়াও আশপাশের পাঁচ জেলার রোগীরা এ হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকেন। এদিকে বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন।

সরেজমিন হাসপাতালের মেডিসিন, শিশু ও সার্জারি ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন। মেডিসিন ওয়ার্ডে নারী-পুরুষের জন্য ৯৮টি শয্যা থাকলেও ভর্তি ৪৬৬ জন। শিশু ওয়ার্ডে ৫৪টি শয্যার বিপরীতে রোগী ২২৮ জন। ৭ম ও ৮ম তলায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পথের সামনে রাখা হয়েছে রোগী। বেশি রোগী অষ্টম তলায়। গাদাগাদি অবস্থা। ফ্লোরে ফ্লোরে এত সংখ্যক রোগী যে পা ফেলার জায়গা নেই। ছোট ওয়ার্ডে বেশি মানুষ থাকায় রোগীদের হাঁসফাঁস অবস্থা। নিচতলায় বহির্বিভাগের কাউন্টারের সামনে হাজারো নারী-পুরুষের দীর্ঘলাইন। বহির্বিভাগে আসা বরুড়ার রোগী ইব্রাহিম খলিল ও নোয়াখালী মাইজদীর হোসনেয়ারা বেগম বলেন, ‘আরও কাউন্টার বাড়ানো প্রয়োজন, তাহলে রোগীদের দুর্ভোগ কমবে। এ ছাড়া সিরিয়ালের বাইরে টিকিট দেওয়া হচ্ছে। এগুলো সম্ভবত দালাল। শুনেছি তারা টিকিট নিয়ে বেশি দামে বিক্রি করেন।’ অষ্টম তলার লাকসামের এক রোগীর স্বজন আলী উল্লাহ বলেন, ‘মেয়েকে এনেছি তিন দিন। ফ্লোরে পড়ে আছি, কোনো সিট পাইনি। চারপাশে মানুষ হাঁটে। আমরা ঠিকমতো ঘুমাতেও পারি না। কখন কার পায়ের নিচে পড়ে যাই।’ লালমাই থেকে আসা রহিমা বেগম বলেন, ‘এখানে চিকিৎসা ভালো, তবে পরিবেশ নেই। বাথরুম অপরিচ্ছন্ন। সিট না থাকায় পথের ধারে (কাছে) পড়ে আছি।’

মেডিসিন বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. মো. আবু রায়হান রাশেদ জানান, তাঁদের বিভাগে নারী ও পুরুষের জন্য ৪৯টি করে মোট ৯৮টি শয্যা রয়েছে। এর বিপরীতে চার থেকে সাড়ে চার গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। বর্তমানে ৪৬৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তারপরও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা। শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ বলেন, ‘এ হাসপাতালে চিকিৎসার মান ভালো হওয়ায় কুমিল্লার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগী আসেন। শিশু ওয়ার্ডে মাত্র ৫৪টি শয্যা রয়েছে। বর্তমানে সেখানে ভর্তি ২২৮ জন। জনবল কম হলেও সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।’ এদিকে বিদ্যমান অবস্থা থেকে উত্তরণে হাসপাতালটিতে শয্যার সংখ্যা বাড়িয়ে ১ হাজারে উন্নীত করার আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. শাহজাহান। তিনি বলেন, ‘ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতিদিন গড়ে ৫-৬ হাজার রোগীকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। ২৫০ শয্যার জনবল দিয়েই ৫০০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনা করতে হচ্ছে। হাজার শয্যায় উন্নীতের আলোচনা চলছে। সেটি বাস্তবায়ন হলে রোগীদের দুর্ভোগ কমবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights