থোক বরাদ্দের টাকা বানে ভেসে যায়

নজরুল মৃধা, রংপুর

প্রতি বছর রংপুর অঞ্চলের তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার, যমুনেশ্বরী, ঘাঘটসহ বিভিন্ন নদনদীতে ভাঙন দেখা দেয়। ভাঙনে শত শত মানুষের বসতভিটা, আবাদি জমি নদীর বুকে হারিয়ে যায়। মাঝে মাঝে এ ভাঙন হঠাৎ করে শুরু হয়। আর তাৎক্ষণিক এ দুর্ভোগ দূর করতে সরকারি দপ্তর পানি উন্নয়ন বোর্ড আপৎকালীন জরুরি থোক বরাদ্দ দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে প্রতি বছর অন্তত ১০ কোটি টাকার এ আপৎকালীন বরাদ্দ থাকে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, থোক বরাদ্দের টাকার বেশির ভাগ কাজই হয় নামকাওয়াস্তে। কিন্তু বরাদ্দের পুরো টাকাই তুলে নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, থোক বরাদ্দের টাকা বানের জলেই ভেসে যায়। সম্প্রতি গঙ্গাচড়ায় তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধে ধস দেখা দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে দরপত্র বরাদ্দ করে ১৪ লাখ টাকা দিয়ে বাঁশের পাইলিং করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর নদীর পানি ফের বাড়লে সেই পাইলিং নদীতে ভেসে গেছে। স্থানীয়দের দাবি বরাদ্দের শতভাগ টাকা ব্যয় করা হলে সেতু রক্ষা বাঁধে ধস দেখা দিত না। এভাবেই থোক বরাদ্দের শত শত কোটি টাকা নয়ছয় করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১০ বছরের রংপুর অঞ্চলের নদী ভাঙন রোধে শত কোটি টাকার বেশি থোক বরাদ্দ এসেছে। এর সিংহ ভাগই গিয়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রভাবশালী মহল ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে। তবে কাগজে কলমে বরাদ্দের টাকা খরচ ঠিকভাবে দেখানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, নদীতে ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)-এর মাধ্যমে বিশেষ থোক বরাদ্দ বা জরুরি বরাদ্দ ছাড় করা হয়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশন বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে আপৎকালীন তহবিল বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে থোক বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়। বরাদ্দ পাওয়ার পর জিও ব্যাগ, কংক্রিট ব্লক ফেলা বা বাঁধ নির্মাণের জন্য দ্রুত ঠিকাদার নিয়োগ বা জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু হয়।

এ ক্ষেত্রে প্রভাবশালীরা দরপত্রের মাধ্যমে কাজ নিয়ে কোনোরকমে কাজ শেষ করে পুরো টাকা তুলে নেন।

সূত্রমতে চলতি মৌসুমে তিস্তা, ধরলা, ঘাঘট, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, যমুনেশ্বরী নদী বেশ কয়েকটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। তিস্তায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী, কোলকোন্দ, মর্নেয়া ইউনিয়নে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে।

ভাঙনে চর এলাকায় বসবাসরত প্রায় অর্ধশত পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন কবলিত এলকায় জরুরি থোক বরাদ্দ নিয়ে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে চেষ্টা করছে। তবে ভাঙন রোধে কী পরিমাণ টাকা থোক বরাদ্দ এসেছে একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত টাকার পরিমাণ জানা যায়নি।

তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, এবার নদী ভাঙন রোধে কমপক্ষে ৫ কোটি টাকার বেশি থোক বরাদ্দ এসেছে।

রংপুর জেলা সুজনের সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, নদীভাঙন রোধে থোক বরাদ্দের শতভাগ বাস্তবায়নই পারে নদীভাঙন রোধ করতে। বরাদ্দের যথাযথ বাস্তবায়নে স্বচ্ছ তদারকির দরকার।

এদিকে রবিবার দুপুরে গঙ্গাচড়া উপজেলার ভাঙনের শিকার নোহালী, কোলকোন্দ ইউনিয়নের চরে বসবাসরত শতাধিক ভুক্তভোগী মিছিল নিয়ে রংপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস ঘেরাও, বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। সে সময় তারা থোক বরাদ্দের অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরেন।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) আহসান হাবিব বলেন বর্তমানে যেসব স্থান নদী ভাঙনের শিকার হচ্ছে সেসব চর এলাকা। চরের ভাঙন রোধে স্থায়ী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছর কী পরিমাণ থোক বরাদ্দ আসে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টাকার পরিমাণ আমার জানা নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights