দেশত্যাগের নোটিশের জবাবে আদালতে যা বললেন ইমরান খান

শোবিজ ডেস্ক
ভারতের মুম্বাইয়ে ঐতিহাসিক আগস্ট ক্রান্তি ময়দানের কাছে ছাত্র বিক্ষোভে উপস্থিতি নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছেন বলিউড অভিনেতা ইমরান খান। বিক্ষোভস্থলে উপস্থিতির কারণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাকে দেশত্যাগের নোটিশ পাঠালে তার বিরুদ্ধে বোম্বে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন এই অভিনেতা। তার প্রধান আইনি যুক্তি হলো, তিনি ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ডধারী, ফলে তিনি কোনো ‘সাধারণ বিদেশি’ নন এবং যৌক্তিক কারণ বা শুনানির সুযোগ ছাড়া তার মৌলিক অধিকার বা ভারতে অবস্থানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা যায় না।

আদালতে পেশ করা আবেদনপত্রে ইমরান খান উল্লেখ করেন, গত ১০ অক্টোবর ছাত্র বিক্ষোভের পরিস্থিতি ঠিক কী দাঁড়িয়েছে এবং সরেজমিনে সেখানে কী ঘটছে—তা জানার একধরনের কৌতূহল থেকে তিনি আগস্ট ক্রান্তি ময়দানের কাছাকাছি গিয়েছিলেন। তবে এলাকাটিতে সাধারণ মানুষের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তা অবগত করার পরপরই তার কৌতূহলের ইতি ঘটে এবং তিনি কোনো প্রতিবাদ না জানিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের পার্কিং করা গাড়ির দিকে ফিরে যান।

২০০৮ সালের সাড়া জাগানো চলচ্চিত্র ‘জানে তু… ইয়া জানে না’ খ্যাত এই অভিনেতা যুক্তি দেন যে, তাকে মূলত সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা ঘিরে ফেলার কারণে একটি হট্টগোল তৈরি হয় এবং এরপরই পুলিশ তাকে আটক করে।

মূলত নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগসাজশে ভারতের সরকারি দল বিজেপির কথিত কারচুপির অভিযোগে নতুন দিল্লি ও মুম্বাইসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে যে বিক্ষোভ সমাবেশ ও প্রতিবাদ চলছিল, এটি ছিল তারই একটি অংশ। যদিও নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দল উভয়ই কারচুপির এই অভিযোগগুলো সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইমরান খান জোর দিয়ে বলেছেন, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সংগঠনের সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পর্ক, অধিভুক্তি বা যোগাযোগ নেই। তা ছাড়া তিনি যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন সেখানে বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি ছিল না, কেবল পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের দেখা যাচ্ছিল।

আমেরিকান নাগরিক হলেও ইমরান খানের জীবনের সিংহভাগ সময় কেটেছে ভারতে। ১৯৮৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী ইমরান মাত্র দুই বছর বয়স থেকেই ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। যদিও ভারতের আইন অনুযায়ী পূর্ণ দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ নেই, তবে ওসিআই কার্ডধারীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতে অবস্থান, বসবাস এবং সম্পত্তি কেনার মতো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন। অবশ্য যেকোনো বিদেশি নাগরিকের মতো ওসিআই কার্ডধারীদের জন্যও ভারতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইমরান খানের পরিবার ভারতের চলচ্চিত্র অঙ্গনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত; তার মা নুজহাত খান পেশায় একজন মনস্তত্ত্ববিদ এবং তিনি খ্যাতনামা পরিচালক-প্রযোজক নাসির হুসাইনের মেয়ে ও সুপারস্টার আমির খানের মামাতো বোন।

আদালতে পেশ করা বিবরণে ইমরান খান জানান, গত ১০ অক্টোবর আনুমানিক বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বান্দ্রা-ওর্লি সি লিঙ্ক হয়ে রওনা দেন এবং বিকেল পাঁচটা নাগাদ নানা চক এলাকায় পৌঁছান। ময়দানের দিকে যাওয়ার রাস্তাটিতে ব্যারিকেড দেখতে পেয়ে তিনি সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের কাছে রাস্তা বন্ধের কারণ জানতে চান। সেখান থেকে ফিরে আসার সময় সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা তাকে চিনে ফেলেন এবং এ সময় তিনি একটি বার্তা সংস্থাকে বলেন যে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে বা প্রতিবাদ জানাতে আসেননি। সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে চলাচলের স্বাধীনতা কেন রুদ্ধ করা হচ্ছে বা মানুষের কণ্ঠ কেন দমন করা হচ্ছে, তা দেখতেই তিনি সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন। এর কিছুক্ষণ পরই, বিকেল ৫টা ১৯ মিনিটে কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই পুলিশ তাকে ও তার পরিবারকে আটক করে নিয়ে যায় এবং পরে ছেড়ে দেয়। পরবর্তীতে গামদেবী থানার পুলিশ এক এফআইআরে তাকে ৩৫০ থেকে ৪০০ লোকের একটি দলকে প্ররোচিত করার অভিযোগে অভিযুক্ত করে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে দাবি করেছেন অভিনেতা।

গত ১৪ অক্টোবর জারি করা ‘লিভ ইন্ডিয়া’ নোটিশে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫’ ভঙ্গের কথা বলা হলেও ঠিক কোন ধারায় বা কোন নির্দিষ্ট অপরাধে তা প্রয়োগ করা হয়েছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বিবরণ উল্লেখ করা হয়নি। প্রথমে কারণ দর্শানোর কোনো সুযোগ না দিয়েই আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) ইমরান খানকে আলাদা একটি শোকজ নোটিশ পাঠায়, যা তার আইনজীবী খতিয়ে দেখছেন এবং আদালতে শুনানির সময় তুলে ধরবেন বলে নিশ্চিত করেছেন।

ইমরান খানের পক্ষে আবেদনপত্রে অভিযোগ করা হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটিতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে বলা হয়, ১০ ও ১২ অক্টোবর ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে ইমরানের বহিষ্কারের দাবি তোলেন। পরবর্তী সময়ে বিজেপি নেতা কিরীট সোমাইয়া প্রকাশ্যে ইমরান খানকে ভারত থেকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানান।

সার্বিক পরিস্থিতিতে বোম্বে হাইকোর্টের কাছে আবেদন জানিয়ে ইমরান খান ওই ‘লিভ ইন্ডিয়া’ নোটিশের কার্যকারিতার ওপর স্থগিতাদেশ, তাকে কালো তালিকাভুক্ত না করা এবং তার ওসিআই কার্ডের মর্যাদা যেন খর্ব করা না হয় সেই মর্মে অন্তর্বর্তী আদেশ প্রার্থনা করেছেন।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights