নানা সংকটে ঝুলছে লাখো আবেদন

গোলাম রাব্বানী

নানামুখী সংকটে নির্বাচন কমিশনে ঝুলে আছে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনীর ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৪টি আবেদন। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, নাগরিকের ভুল; ভুয়া কাগজপত্র; তথ্যের গরমিল; একাধিক জন্মনিবন্ধন সনদ; বাস্তবতার সঙ্গে সংশোধন চাওয়া তথ্যের মিল নেই; গলা কাটা পাসপোর্ট; প্রবাসীদের অসম বয়স সংশোধনের আবেদন, পাসপোর্ট সংশোধন করে বিদেশে যাওয়া; দত্তক গ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণেই অধিকাংশ এনআইডির সংশোধন আবেদন ঝুলে আছে। এসব জটিলতা নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এদিকে বছরের পর বছর এত আবেদন ঝুলে থাকায় নাগরিকরাও ভোগান্তির অভিযোগ করছেন। এনআইডি সংশোধনকে কেন্দ্রে করে ভয়ংকর চক্রও দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এই চক্র ফেসবুক ও হোয়াটস অ্যাপে নানা গ্রুপ খুলে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।

ইসি সূত্র জানিয়েছে, ৩ নভেম্বর পর্যন্ত কমিশনে ছয়টি ক্যাটাগরির মোট ৬৬ লাখ ১২ হাজার ৪৩৩টি সংশোধন আবেদন এসেছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৮৯টি। আর ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৪টি আবেদন ঝুলে আছে। এসব আবেদনের প্রায় ৯২ শতাংশই চলতি বছরের। মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৪টি অনিষ্পন্ন আবেদনের মধ্যে ৭৩ হাজার ৩৭২টিই ‘ঘ’ ক্যাটাগরির। এই ক্যাটাগরিতে নাম বা ব্যক্তিগত তথ্য পরিবর্তনের আবেদন করা হয়। এ ক্ষেত্রে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালকের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে।

নির্বাচন কমিশন এনআইডি সংশোধনের আবেদনগুলোকে মোট ছয়টি ভাগে ভাগ করেছে- ক, ক-১, খ, খ-১, গ ও ঘ। এর মধ্যে ‘ক’ ক্যাটাগরিতে নামের বানান বা ছোটখাটো ভুল ঠিক করা হয়। ‘খ’ ক্যাটাগরিতে থাকে ছবি, স্বাক্ষর বা অন্যান্য তথ্য পরিবর্তনের বিষয়। ‘গ’ ক্যাটাগরিতে নাম কিংবা বাবা-মায়ের নামের বড় কোনো পরিবর্তন করা হয়। আর ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে জন্ম তারিখ, বয়স, বাবা-মায়ের নামের তথ্য সংশোধন করা হয়। এ ছাড়া ‘ক-১’ ও ‘খ-১’ ক্যাটাগরিতে ছোটখাটো বানান বা ভুল সংশোধনের কাজ করা হয়। বর্তমানে অনিষ্পন্ন আবেদনগুলোর মধ্যে ‘ঘ’ ক্যাটাগরির পরেই সবচেয়ে বেশি আবেদন ঝুলে আছে ‘খ’ ক্যাটাগরিতে। এই ক্যাটাগরিতে অনিষ্পন্ন আবেদন জমে আছে ২১ হাজার ৩২৮টি। এরপর ‘ক’ ক্যাটাগরির ১৯ হাজার ৪৪টি, ‘গ’ ক্যাটাগরির ১৬ হাজার ৮১৫টি, ‘খ-১’ ক্যাটাগরির ৪ হাজার ৬০৭টি এবং ‘ক-১’ ক্যাটাগরির ১৪৭৮টি আবেদন ঝুলে আছে। এ বিষয়ে এনআইডি শাখার একজন পরিচালক বলেন, নানামুখী জটিলতার কারণেই এনআইডি সংশোধন ঝুলে আছে। প্রতিটি আবেদনের পেছনেই আলাদা গল্প থাকে। নাগরিকরা যে বয়স সংশোধন চায় সেক্ষেত্রে অনেকের পারিবারিক ও ওয়ারিশ সনদে দেখা যায় এক ভাই-বোন থেকে অন্য একজনের জন্মগ্রহণের বা জন্ম তারিখের পার্থক্য ছয়-সাত মাস; আবার যে বয়স সংশোধন চায় সেই অনুযায়ী তার ভোটার হওয়ার বয়স হয় ৭ বা ৮ বছর।

তিনি বলেন, এসব আবেদনের অনেক আবেদনকারী তাদের তথ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন চায়। এর মধ্যে অধিকাংশের অসৎ উদ্দেশ্য থাকে। আমরা সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দ্রুত নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করছি। আবার অনেকেই এনআইডির নাম পরিবর্তন করে জমি দখল বা ঋণ নিচ্ছেন জালিয়াতি করে।

দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে ভয়ংকর চক্র : এদিকে এনআইডি সংশোধনকে কেন্দ্রে করে ভয়ংকর চক্র দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এই চক্র ফেসবুক ও হোয়াটস অ্যাপে নানা গ্রুপ খুলে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে এনআইডি জালিয়াতি করে অন্যের জমি দখল করারও। ইসির তথ্যভান্ডার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নাগরিকের তথ্য অবৈধভাবে বেচাকেনা হচ্ছে। গত ১৫ জানুয়ারি জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি ও নাগরিকের গোপনীয় তথ্য অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মীসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নাগরিকের তথ্য বেচাকেনায় মাসে কোটি টাকার বেশি লেনদেন করতেন তারা।

জানা গেছে, দেশের ১৮ লাখেরও বেশি নাগরিকের তথ্য ডার্ক ওয়েবে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ব্রেইন স্টেশন ২৩ পিএলসির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগ সাইবারস্টেশন। দেশের ১৫টি খাতের ৭৬৭টি ডোমেইন পর্যালোচনা করে প্রায় সবকটির ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের প্রমাণ পেয়েছে এই সংস্থাটি।

ইসির এক কর্মকর্তা জানান, এনআইডি সার্ভারের তথ্য অনৈতিকভাবে সংশোধন, স্থানান্তরের জন্য ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড এবং ওটিপি দেওয়া হতো একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। আর এজন্য প্রতিদিন মিলত ৫ হাজার টাকা। হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপের ওই চক্রটি আবার তা সরবরাহ করত বিভিন্ন কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে। আর এভাবেই চলত রমরমা ব্যবসা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ইসি নাগরিকদের সেবা দিচ্ছে। অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights