না ফেরার দেশে ‘বীরাঙ্গনা’ ফুলমতি, শেষ হলো ৪৫ বছরের স্বীকৃতির লড়াই

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যায় ফুলমতির ডান হাত ও পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ ঘরেই তার মৃত্যু হয়। শুক্রবার বিকেলে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হবে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।

ফুলমতির ছেলে মনিরাজ কুমার বলেন, তার মা দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। শয্যাশায়ী অবস্থাতেও তিনি আত্মমর্যাদা নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন।

লেখক ও গবেষক জহুরুল কাইয়ুম সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক প্রকাশনা ‘হৃদয়ে একাত্তর’-এ ফুলমতির জীবনের বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে তাকে ‘ফুলমতি রানী’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সাদুল্লাপুর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের অর্জুন রবিদাস ও ফু রানী রবিদাসের মেয়ে। তার চার ছেলে—রতন, নিরঞ্জন, মনিরাজ ও সুজন এবং এক মেয়ে সপ্তমী।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিদের বাড়িতে ঢুকে তাকে নির্যাতন করে বলে ‘হৃদয়ে একাত্তর’-এ উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনার পর দীর্ঘ জীবন সেই নির্যাতনের স্মৃতি বয়ে বেড়িয়েছেন তিনি।

স্বাধীনতার পরও দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি ফুলমতি। সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দীর্ঘদিন আবেদন-নিবেদনের পর ২০১৬ সালের মার্চে তিনি বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এই স্বীকৃতি পান তিনি।

স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়ার ১৯৮৮ সালে মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটান ফুলমতি। সাদুল্লাপুর উপজেলা সদরের পাশে সরকারি খাসজমিতে একটি জীর্ণ কুটিরে বসবাস করতেন তিনি। রাষ্ট্রের কাছ থেকে পেয়েছিলেন বয়স্ক ভাতার কার্ড।

২০১০ সালে ঢাকার স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের সহযোগিতায় স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য জেনেসিস ও উপজেলা সামাজিক উদ্যোক্তা দল ফুলমতিকে সম্মাননা ও উপহার দেয়।

সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির ত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দীর্ঘদিন স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত থাকার পর অনেক চেষ্টা ও আবেদনের মাধ্যমে ২০১৬ সালে তিনি স্বীকৃতি পান।

আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, শয্যাশায়ী অবস্থায় ফুলমতির চিকিৎসায় সরকারি পর্যায় থেকে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি বা তার পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি।

ফুলমতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক, শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিরা শোক জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের এই জীবন্ত ইতিহাস সংরক্ষণে ফুলমতির সমাধিস্থলে স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক। নতুন প্রজন্মের কাছে তার নির্যাতন, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস তুলে ধরারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

মৃত্যুকালে ফুলমতি চার ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights