নিষেধাজ্ঞাভুক্ত রুশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধ, দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় ধস
অনলাইন ডেস্ক
নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত একটি রুশ প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সৃষ্ট সাইবার বিভ্রাটের কারণে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো মারাত্মকভাবে অচল হয়ে পড়েছে। রবিবার রাত থেকে লাখ লাখ ব্যবহারকারীর কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও আন্তঃব্যাংক লেনদেন বন্ধ রয়েছে। দেশের ৩৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে প্রাথমিক পেমেন্ট প্রসেসিং ও গেটওয়ে অবকাঠামো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইনফরমেশন টেকনোলজিস কনসালট্যান্টস লিমিটেডের (আইটিসিএল) সঙ্গে রুশ প্রতিষ্ঠান কম্পাস প্লাসের সফটওয়্যার মাইগ্রেশন কেন্দ্রিক বিরোধ থেকে এই সংকটের সূত্রপাত। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং-কার্ড লেনদেনের প্রায় ৭০ শতাংশই এই কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আইটিসিএলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
আইটিসিএল জানায়, ব্রাসেলস-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওপেনওয়ের তৈরি এন্টারপ্রাইজ পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘ওয়ে৪’ দিয়ে তাদের প্ল্যাটফর্ম প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে; এমন খবর জানতে পেরে রুশ প্রতিষ্ঠানটি আইটিসিএলের সার্ভারে একটি ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট বসিয়ে দেয়। এই ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট প্রতি আট ঘণ্টা পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইটিসিএলের সার্ভারগুলোকে রিস্টার্ট করে দেয়, যার ফলে রাউটিং টেবিলগুলো মুছে যায় এবং পুরো নেটওয়ার্কজুড়ে ডেটা প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা বন্ধ হয়ে যায়। গত আগস্টে আইটিসিএল ১২ থেকে ১৮ মাসের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কম্পাস প্লাসের প্ল্যাটফর্মটি পর্যায়ক্রমে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালে এই বিরোধ তীব্র হয়। অভিযোগ রয়েছে, এর প্রতিক্রিয়ায় কম্পাস প্লাস কারিগরি সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ১.৫ মিলিয়ন ডলার মাইগ্রেশন ফি দাবির পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থনযুক্ত আগাম পেমেন্ট গ্যারান্টিও দাবি করে বসে।
পরিস্থিতি নিয়ে আইটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাজী সাইফুদ্দিন মুনির গণমাধ্যমকে বলেন, সমস্যাটি চিহ্নিত করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সব অংশীদার ব্যাংককে সতর্ক করে দিই। গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষিত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আশা করছি বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের পর আবারও সেবা চালু করা যাবে।
এদিকে পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে পেমেন্ট সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে রেগুলেটরি সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। অচল অবস্থা নিরসনে সোমবার ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ও আইটিসিএলকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টায় হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এটা স্পষ্ট একটা কারিগরি সমস্যা, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে এটা সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কার্ডধারীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তিনি নিশ্চিত করেন, হঠাৎ সেবা বন্ধ করে দেওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সদস্য ব্যাংকগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবে। নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো পূর্বনির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের আগে জাতীয় গণমাধ্যম, টেলিভিশন ও সরাসরি টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে জনসাধারণকে পর্যাপ্ত সময় আগে অবহিত করা বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের তথ্যমতে, আইটিসিএলের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ প্রথমে অক্টোবরের শেষের দিকে হওয়ার কথা ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘রোববার সন্ধ্যায় আইটিসিএল হঠাৎ করে আমাদের জানায়, তাদের জরুরি ভিত্তিতে সেবাটি অফলাইনে নিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন, তারা যদিও দাবি করেছে, জরুরি পরিস্থিতি তাদেরকে এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। কিন্তু পূর্বঘোষণা ছাড়া এমন গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট অবকাঠামো বন্ধ করে দেওয়া রেগুলেটরি কাঠামোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আইটিসিএলের ওয়েবসাইটের এক বিজ্ঞপ্তি অনুসারে রোববার (৪ অক্টোবর) রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে আকস্মিক এই বন্ধের ফলে দেশজুড়ে লাখ লাখ সাধারণ গ্রাহক রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও এটিএম বুথগুলোতে চরম বিপাকে পড়েন এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ লেনদেন বা অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স চেক করতেও ব্যর্থ হন।
হঠাৎ সেবা বন্ধ হওয়ায় সদস্য ব্যাংকগুলোর সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ায় তারা তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছে। তারা বলছেন, আইটিসিএল রবিবার সন্ধ্যায় বিষয়টি আমাদের জানায়, ঠিক যেদিন তারা সেবাটি বন্ধ করে দেয়। গ্রাহকদের জানানোর জন্য আমাদেরকে একদিন সময়ও দেওয়া হয়নি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা আরও বলেন, সম্পূর্ণ অপেশাদার পদক্ষেপ ছিল এটি। এ পদক্ষেপ সব সদস্য ব্যাংকের ওপর গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট করে দিয়েছে।
সৌজন্যে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
