পরাজয় কি শুধু ট্রাম্পেরই?
পনিয়েল এস বোস, নিউইয়র্ক থেকে
মার্কিন রাজনীতিতে ক্ষমতার মসনদ যেমন স্থায়ী নয়, তেমনি নির্বাচনি বিজয়ের আনন্দও চিরস্থায়ী নয়। হোয়াইট হাউস জয়ের উল্লাস কখনো দুই বছর না পেরোতেই রূপ নেয় রাজনৈতিক হতাশায়। যে ভোটাররা বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে একজন প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতায় বসান, তাঁরাই আবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই প্রেসিডেন্টের দলের বিরুদ্ধে রায় দেন। কখনো অর্থনীতির হিসাব মেলেনি, কখনো প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব বেড়েছে, আবার কখনো ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্যে লাগাম টানতে চেয়েছেন ভোটাররা।
এবার সেই বাস্তবতারই মুখোমুখি ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর রিপাবলিকান দল বড় ধাক্কা খেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে এমন বিপর্যয় কি শুধু ট্রাম্পের ভাগ্যেই জুটেছে? ইতিহাস বলছে, মোটেও নয়। এই ভরাডুবির পাল্লায় একসময় ছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ছিলেন বারাক ওবামাও। বাদ যাননি রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। এমনকি জো বাইডেনের আমলেও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন ডেমোক্র্যাটরা।
২০২৬ সালে ট্রাম্পের দল কতটা হারল : ৫ নভেম্বর বিকাল ৪টা পর্যন্ত রয়টার্সের হিসাবে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের ২৪৭টি এবং রিপাবলিকানদের ১৫৪টি আসনে জয় নিশ্চিত হয়; তখন ৩৪টি আসনের ফল বাকি। সিনেটে ডেমোক্র্যাটপন্থি আসন ৫৪ এবং রিপাবলিকান আসন ৪৪; দুটি আসনের ফল অনিষ্পন্ন ছিল। ওই সময় পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটদের নিট লাভ প্রতিনিধি পরিষদে ৩৮ এবং সিনেটে ৭ আসন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে।
ক্লিনটনের সময়েও ছিল বড় ধরনের পরাজয় : ১৯৯৪ সালে ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মাথায় বিল ক্লিনটনের ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৫৪ এবং সিনেটে ৮ আসন হারায়। কংগ্রেসের দুই কক্ষই চলে যায় রিপাবলিকানদের হাতে। সেই ফল ছিল ক্লিনটন প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়। তবে চার বছর পর ১৯৯৮ সালে তাঁর দল প্রতিনিধি পরিষদে চারটি আসন বাড়িয়েছিল।
ওবামার আমলেই তিন দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ ভরাডুবি, এক নির্বাচনেই উধাও ৬৪ আসন : ২০১০ সালে বারাক ওবামার ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৬৪টি আসন হারায়-মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সরকারি ঐতিহাসিক হিসাবে ১৯৯৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোর মধ্যে এটিই ক্ষমতাসীন দলের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। সিনেটেও দলটির ছয়টি আসন কমে। ২০১৪ সালে ফের প্রতিনিধি পরিষদে ১৩ এবং সিনেটে ৯ আসন হারায় ডেমোক্র্যাটরা; সিনেটের নিয়ন্ত্রণও হাতছাড়া হয়। বুশের আমলেও ভরাডুবি, হাতছাড়া কংগ্রেসের দুই কক্ষ : ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে আটটি ও সিনেটে দুটি আসন বাড়ান। কিন্তু ২০০৬ সালের নির্বাচনে পরিস্থিতি বদলে যায়। প্রতিনিধি পরিষদের সরকারি দলীয় পরিবর্তনের হিসাবে রিপাবলিকানরা ৩১টি আসন হারান; সিনেটেও ছয়টি আসন কমে। দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই চলে যায় ডেমোক্র্যাটদের হাতে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও বড় ধাক্কা, বাইডেনও বাদ যাননি : ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ৪২টি আসন হারান এবং কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হয়। তবে সিনেটে আসন বাড়ে। ২০২২ সালে জো বাইডেনের ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে নয়টি আসন হারিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান, যদিও সিনেটে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হয়।
কার পরাজয় বেশি, কার কম : প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারানোর মাপকাঠিতে ১৯৯৪-২০২২ সময়ের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ওবামার ২০১০ সালের ৬৪ আসন। এরপর ক্লিনটনের ১৯৯৪ সালের ৫৪, ট্রাম্পের ২০১৮ সালের ৪২ এবং বুশের ২০০৬ সালের ৩১ আসন ক্ষতি। কিন্তু কংগ্রেসের দুই কক্ষ একসঙ্গে হারানোর বিচারে ক্লিনটনের ১৯৯৪, বুশের ২০০৬ এবং ট্রাম্পের ২০২৬ সালের নির্বাচন আলাদা গুরুত্ব পায়।
কেন ক্ষমতাসীনদের এমন পরীক্ষা : প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ভোটারদের প্রত্যাশা থাকে বড়। কিন্তু দুই বছরের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়, চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা, যুদ্ধ, অভিবাসন কিংবা প্রতিশ্রুত সংস্কারের ফল সবাই সমানভাবে অনুভব করেন না। অসন্তোষ জমলে তার প্রভাব পড়তে পারে মধ্যবর্তী নির্বাচনে। আবার ভোটাররা কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতেও ভিন্ন দলকে সমর্থন করতে পারেন। সব নির্বাচনের ব্যাখ্যা অবশ্য এক নয়। রয়টার্সের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রশাসনের নীতির প্রতি ক্ষোভকে এবারের ফলের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
পরাজয়-বিজয়ের মধ্যেই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য : মার্কিন গণতন্ত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা একক নয়। আইন প্রণয়ন, বাজেট ও প্রশাসনিক তদারকিতে কংগ্রেসের নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায়; সমঝোতার প্রয়োজন বাড়ে, আবার রাজনৈতিক অচলাবস্থার ঝুঁকিও তৈরি হয়। এটাই চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সেস ব্যবস্থার একটি বাস্তব দিক। তাই ট্রাম্পের এবারের পরাজয়কে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। ক্লিনটন, বুশ, ওবামা ও বাইডেন-সব পক্ষই কোনো না কোনো সময় ভোটারদের কঠিন রায়ের মুখে পড়েছেন। ক্ষমতা কারও স্থায়ী সম্পত্তি নয়; জনগণই সময়ে সময়ে তার হিসাব নেন।
