পাকিস্তান ও সন্ত্রাসবাদ : যখন পাশার দান উল্টে যায়

অনলাইন ডেস্ক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ আফগানিস্তানকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলাকারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-এর নাম উল্লেখ করে আফগান ভূখণ্ড যেন পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করতে আফগান তালেবানকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তবে পাকিস্তানের একজন শীর্ষ নেতার কাছ থেকে এমন দাবি ওঠায় নানা প্রশ্নও সামনে আসে। প্রতিবেশী দেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দেওয়ার বিপদ পাকিস্তান কবে থেকে উপলব্ধি করল? তালেবান যখন আফগানিস্তানে রিপাবলিক সরকার ও সাধারণ আফগান মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল এবং আফগান নাগরিকরা ভুক্তভোগী হচ্ছিলেন, তখন এই উদ্বেগ কোথায় ছিল? বছরের পর বছর তালেবানকে সমর্থন দিয়ে আসা একই সরকার এখন কীভাবে সন্ত্রাসী আস্তানার কথা বলছে—যেন এই পরিস্থিতি তৈরির পেছনে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না?

তালেবানের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থন নিয়ে আফগানদের অভিযোগকে নিছক ক্ষোভ বা ভিত্তিহীন দাবি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই—এমনটাই উঠে এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে। আর্থিক সহায়তা, যোদ্ধা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, গোলাবারুদ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং পাকিস্তানি সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তালেবানের সহযোগিতার বিষয়গুলো বহু বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে নথিবদ্ধ হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের আলোকে বলা হয়, গত ২৫ বছরের অধিকাংশ সময়জুড়ে পাকিস্তান এমন একটি শক্তিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে, যারা আফগানিস্তানের জনগণের ওপর যুদ্ধ ও দমন-পীড়ন চালিয়েছে।

হাক্কানি নেটওয়ার্ক এই বিতর্কের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। উত্তর ওয়াজিরিস্তানে তাদের নিরাপদ আশ্রয় এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি বহু বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সরকারি আপত্তির কেন্দ্রে ছিল। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের তৎকালীন চেয়ারম্যান মাইক মুলেন হাক্কানি নেটওয়ার্ককে কার্যত ‘পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার একটি হাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তবে ইসলামাবাদ সে অভিযোগ অস্বীকার করে। এখন পাকিস্তান যখন সীমান্তের ওপারে সন্ত্রাসী আস্তানার অভিযোগ তুলছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—এক দশক আগে হাক্কানি নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে একই ধরনের অভিযোগ কেন প্রত্যাখ্যান করেছিল তারা?

২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আফগানদের ‘দাসত্বের শৃঙ্খল’ ভাঙার কথা বলেছিলেন। ওই মন্তব্যকে তালেবানের বিজয়ের প্রতি ইসলামাবাদের ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু তালেবান এখন পাকিস্তানের প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ না করায় সেই একই বিজয় আজ ইসলামাবাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হলো, তালেবানের চরিত্র কি এখন নতুন করে স্পষ্ট হলো, নাকি তালেবানের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার পাকিস্তানি হিসাবই ভুল প্রমাণিত হয়েছে?

এই অবস্থান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের নীতির একটি বড় বৈপরীত্যের বিষয় সামনে আসে। তালেবান যখন আফগানিস্তানে লড়াই করছিল এবং পাকিস্তানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল, তখন তাদের প্রতি সমর্থনের পক্ষে যুক্তি দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু এখন তালেবানের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই লড়াই করায় ইসলামাবাদ আস্তানা, সমর্থন ও স্বাগতিক রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলছে। কোনো মানুষ নিহত হওয়ার স্থান বদলে গেলে মানবজীবনের মূল্যও বদলে যাওয়ার কথা নয়।

অবশ্যই, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসবাদের শিকার। টিটিপি একটি বাস্তব হুমকি এবং এর মোকাবিলা করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে একই মানদণ্ড পাকিস্তান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হাতে ক্ষতিগ্রস্ত আফগানিস্তান ও ভারতের ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত—এমন যুক্তি রয়েছে। নিজ দেশের মানুষের দুর্ভোগকে সামনে রেখে অন্য দেশে মানুষের জীবন বিপন্নকারী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের অভিযোগের ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না।

টিটিপির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অবস্থান নতুন নয়। টিটিপি এবং পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো অন্যান্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইসলামাবাদ অভিযানও চালিয়েছে। ফলে বিষয়টি এমন নয় যে পাকিস্তান কখনো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি। বরং প্রশ্ন হলো, সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণের দিকের ওপর ভিত্তি করে কেন তাদের প্রতি পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া বদলে যায়? সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতা যদি নীতিগত অবস্থান হয়, তাহলে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে যোদ্ধা নিয়োগ, অর্থ সংগ্রহ ও হামলা সংগঠিতকারী নেটওয়ার্কগুলোকেও একইভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করার কথা।

এই বিতর্কে লস্কর-ই-তৈয়বার প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা কমিটির নথিতে পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বাকে বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; এর মধ্যে ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার কথাও উল্লেখ রয়েছে। একই নথিতে জামায়াত-উদ-দাওয়াকে লস্কর-ই-তৈয়বার অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

জইশ-ই-মহম্মদও (জেইএম) আরেকটি উদাহরণ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে কারাবন্দি থাকার পর মুক্তি পেয়ে ১৯৯৯ সালে মাসুদ আজহার সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের নথিতে জেইএমের পাকিস্তানে ঘাঁটি এবং কাশ্মীরে কার্যক্রমের পাশাপাশি তালেবান ও আল-কায়েদার সঙ্গে এর সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

হিজবুল মুজাহিদিন কাশ্মীরে দীর্ঘদিন সক্রিয় আরেকটি গোষ্ঠী। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইউসুফ শাহ, যিনি সৈয়দ সালাহউদ্দিন নামে পরিচিত। গোষ্ঠীটি জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও রাজনীতিকদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন হামলার দায় স্বীকার করেছে।

হরকাতুল মুজাহিদিনও এসব আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্কের আরেকটি উদাহরণ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নথি অনুযায়ী, গোষ্ঠীটির ঘাঁটি পাকিস্তানের মুজাফফরাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি ও অন্যান্য এলাকায় ছিল এবং কাশ্মীরে ভারতীয় সেনা ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে তাদের কার্যক্রমের উল্লেখ রয়েছে। একই নথিতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং ১৯৯৯ সালের ভারতীয় বিমান ছিনতাইয়ের সঙ্গে সংগঠনটির সংশ্লিষ্টতার কথাও বলা হয়েছে।

এই ইতিহাস থেকে বিশ্লেষকেরা যে প্রশ্নটি তুলছেন, তা হলো—পাকিস্তানভিত্তিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে আঞ্চলিক সহিংসতার সম্পর্ক কেবল আফগান তালেবানকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ ছিল কি না। জাতিসংঘের নথিতে তালিকাভুক্ত একাধিক গোষ্ঠীর কার্যক্রমের কারণে বিষয়টি কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা বিশ্ব এবং ব্রিটেনের জন্য পাকিস্তান প্রায় তিন দশক ধরে ‘এই নোংরা কাজ’ করে আসছে। একই সঙ্গে তিনি এটিকে ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এর মূল্য পাকিস্তানকে দিতে হয়েছে।

তবে এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়—আফগানিস্তানের মানুষ যে মূল্য দিয়েছে, তার কী হবে? যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ভূমিকার দিকে আঙুল তুললেই কি পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের দায়মুক্ত করা সম্ভব?

পাকিস্তান যদি চায় তাদের বক্তব্য আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পাক, তাহলে তালেবানের কাছে তারা যে দাবি করছে—আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ—তা নিজেদের ভূখণ্ডেও বাস্তবায়নের দাবি উঠছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কোনো রাষ্ট্রের অবস্থান তখনই বিশ্বাসযোগ্যতা পায়, যখন কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে অতীত রাজনৈতিক সম্পর্ক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

পাকিস্তান যখন নিজের মাটিতে পরিচিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ, নিয়োগ বা রিক্রুটমেন্ট রোধ এবং তাদের অপারেশনাল অবকাঠামোর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, তখনই তাদের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব কর্মকাণ্ডের সামঞ্জস্য তৈরি হবে—এমনটাই এই বিতর্কের মূল প্রশ্ন।

তা না হলে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের বক্তব্য কেবল বক্তব্য হিসেবেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ কিংবা বর্তমানে যে নিরাপত্তা হুমকির কারণে ইসলামাবাদ এসব অভিযোগ তুলছে, সেগুলোর সমাধানও তখন কঠিন হয়ে পড়বে।

২০১১ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বহুল আলোচিত সতর্কবার্তাটিও এ প্রসঙ্গে সামনে আসে: ‘আপনি নিজের পেছনের উঠানে সাপ পুষবেন, আর সে শুধু আপনার প্রতিবেশীদের কামড়াবে—এমন আশা করতে পারেন না।’

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালেও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের ভাষ্য ও নীতির মধ্যে সামঞ্জস্যের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। ইসলামাবাদ নিজেদের দিকে আসা হুমকির অবসান চায়। একই সঙ্গে তাদের দেখাতে হবে, প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তারা একই মানদণ্ড প্রয়োগ করছে কি না। সন্ত্রাসবাদ যখন পাকিস্তানের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধিতে সহায়ক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, তখনও তা কম বিপজ্জনক বা কম অপরাধমূলক ছিল না—এমন যুক্তিই এই বিতর্কের কেন্দ্রে।

পাকিস্তানের বর্তমান তালেবানবিরোধী অবস্থানকে তাই কেবল একটি পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হবে, নাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কৌশলগতভাবে ব্যবহারের দীর্ঘদিনের নীতি থেকে বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হবে—তা নির্ভর করবে ইসলামাবাদের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ আফগানিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের অভয়ারণ্য হিসেবে আখ্যা দেওয়ার আগে আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি তৈরিতে পাকিস্তানের অতীত ভূমিকা কী ছিল, সেই প্রশ্নেরও জবাব দেওয়ার দাবি উঠছে। আফগান জনগণ পাকিস্তানকে তালেবানকে সমর্থন দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়নি—এই যুক্তি সামনে রেখে বলা হচ্ছে, অতীতের সেই নীতিগত ভুলের মূল্য আফগান জনগণের বহন করা উচিত নয়।

—ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত মতামত কলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights