পাটের দাম বাড়ায় হাসি কৃষকের মুখে

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাটের ভালো ফলন, অনুকূল আবহাওয়া ও বাজারে বাড়তি দাম-সব মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাট চাষিদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি। গোপালগঞ্জে উৎপাদন ছাড়িয়েছে লক্ষ্যমাত্রা, নওগাঁয় মানসম্মত পাটের চাহিদা বেড়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জেও গত বছরের তুলনায় ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকরা। এতে পাট চাষে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। তবে এ ধারা ধরে রাখতে সরকারি প্রণোদনা, কৃষি পরামর্শ এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। গোপালগঞ্জের বিভিন্ন হাটবাজারে জাত ও মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ৩০০ টাকায়। গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি দাম বেড়েছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। পাটকল ও মজুতদারদের কেনাকাটা বাড়ায় বাজারে বেচাকেনাও জমে উঠেছে। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে মণপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন কৃষকরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামারবাড়ির উপপরিচালক ড. মো. মামুনুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে জেলার পাঁচ উপজেলায় ২৪ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কৃষকরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮২৭ হেক্টর বেশি জমিতে আবাদ করেছেন। মোট আবাদ হয়েছে ২৫ হাজার ৬৮৬ হেক্টর জমিতে। এতে পাট উৎপাদিত হয়েছে ৫২ হাজার ৬৫৬ মেট্রিক টন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৬৯৬ টন বেশি। প্রতি মণ পাট উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা। বর্তমান দাম অব্যাহত থাকলে আগামী বছর আবাদ আরও বাড়তে পারে বলে আশা করছেন তিনি।

কাশিয়ানী উপজেলার সবচেয়ে বড় পাটের হাট ভাটিয়াপাড়া বাজারে শুক্রবার ও সোমবার বেচাকেনা হয়। বাজারের পাট ও ভুসিমাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিয়ামুল হক শরীফ জানান, এখানে প্রায় ১২০টি পাটের আড়ত ও অন্তত ১০০টি ছোট-বড় গুদাম রয়েছে। প্রতি হাটে ১ হাজার থেকে ২ হাজার মণ পাট কেনাবেচা হচ্ছে। গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও নড়াইলের পাট এ বাজারে আসে।

আড়তদার শামীম শেখ বলেন, মৌসুমের শুরুতে পাটকলগুলো কেনাকাটা ও মূল্য পরিশোধ বন্ধ রাখায় এবং মজুতদারদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় পাটের দাম তিন দফায় কমেছিল। তখন প্রতি মণ পাট বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। এখন মিল ও মজুতদাররা বেশি দামে পাট কেনায় বাজারে সরবরাহ ও বেচাকেনা বেড়েছে। কাশিয়ানীর বরাশুর গ্রামের কৃষক মফিজুর রহমান শেখ ১৮০ শতাংশ জমিতে পাট চাষ করে ৫২ মণ পাট পেয়েছেন। তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে পাট জাগ দিতে সমস্যা হয়নি। গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বেশি পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। এমন দাম থাকলে আগামী বছর আবাদ বাড়াবেন। গোপালগঞ্জ আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান জানান, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় মোট ১ হাজার ৩৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা পাট জাগ দিতে সহায়ক হয়েছে।

নওগাঁয়ও ভালো ফলন ও মানসম্মত আঁশের কারণে পাটের বাজার চাঙা। জেলার বিভিন্ন বাজারে প্রতি মণ শুকনা পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায়। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম বেড়েছে অন্তত ৬০০ টাকা। জেলার বৃহত্তম পাটের হাট মান্দার সতীহাটে ভালো মানের পাটের সর্বোচ্চ দাম উঠছে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। কৃষকদের হিসাবে, প্রতি বিঘা জমিতে আবাদ থেকে শুরু করে পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানো পর্যন্ত খরচ হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা। বর্তমান বাজারদরে বিঘাপ্রতি নিট লাভ হচ্ছে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা পর্যন্ত।

তবে নওগাঁয় দীর্ঘমেয়াদে পাটের আবাদ কমেছে। ২০২১-২২ মৌসুমে ৫ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হলেও ২০২৪-২৫ মৌসুমে তা নেমে আসে ৩ হাজার ৫৫০ হেক্টরে। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে আবাদ হয়েছে ৩ হাজার ১৭০ হেক্টরে। এ জমি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৮ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান জানান, ৮০০ কৃষককে বিনামূল্যে বীজ, সার, পরিবহন খরচ ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে কৃষক পর্যায়ে চাহিদা ও দাম আরও বাড়বে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি মৌসুমে প্রতি মণ পাটের দাম গত বছরের তুলনায় ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে জাত ও মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায়। শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার কৃষকরা ভালো ফলন ও দামের আশায় পাট ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার কৃষক ২ হাজার ৪০ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ করেছেন। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৮ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। ১ হাজারের বেশি কৃষককে বীজ ও সারসহ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে পাটের দাম বাড়ায় কৃষকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হলেও উৎপাদন ব্যয়, বাজারের ওঠানামা ও দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষকদের প্রণোদনা ও কারিগরি সহায়তা বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের ব্যবহার সম্প্রসারণ করা গেলে ‘সোনালি আঁশের’ চাষ আবারও লাভজনক হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights