পারমাণবিক সাবমেরিন নিয়ে জাপান এতো তাড়াহুড়ো করছে কেন?
অনলাইন ডেস্ক
চীন যখন পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে নিজেদের নৌবহর ও সাবমেরিনের উপস্থিতি প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে চলেছে, ঠিক তখনই এশিয়ার সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে নতুন করে ভাবছে জাপান। উদীয়মান সূর্যের দেশ জাপানে এখন জোর আলোচনা চলছে; দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে জোরদার করতে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন কেনা বা তৈরি করা উচিত কি না। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, যা দেশটির ঐতিহ্যগত প্রতিরক্ষা নীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে টোকিওর নীতি নির্ধারণী মহলে এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, কারণ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, আইনি জটিলতা এবং বিশাল আর্থিক সাশ্রয়ের হিসাব-নিকাশ এখনো একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সাম্প্রতিক বক্তব্য এই আলোচনাকে নতুন এক মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা রূপরেখা সম্পর্কিত তিনটি মূল দলিল পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া শুরু করে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁর সরকার অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও বস্তুনিষ্ঠ উপায়ে পারমাণবিক সাবমেরিনের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখবে। পারমাণবিক সাবমেরিন মাসের পর মাস পানির নিচে অবস্থান করতে পারে, উচ্চ গতি ধরে রাখতে সক্ষম এবং উপকূল থেকে অনেক দূরে দীর্ঘমেয়াদী মিশন পরিচালনা করতে পারে। জাপানের মতো সমুদ্রবেষ্টিত দেশের জন্য যা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত লাভজনক হতে পারে। তবে এই সুবিধা পেলেই যে অতি দ্রুত পারমাণবিক শক্তিতে পদার্পণ করা যাবে, বিষয়টি তা নয়। এই প্রযুক্তির পেছনে বিশাল অর্থ ও সময় ব্যয় ছাড়াও রয়েছে নানা আইনি ও পরিচালনাগত বাধা।
এই বিতর্কের পেছনে মূল রাজনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে জাপানের বর্তমান ক্ষমতাসীন জোটের জুনিয়র অংশীদার ‘জাপান ইনোভেশন পার্টি’। তাদের প্রবীণ আইন প্রণেতারা মনে করেন, চীনের নৌশক্তির দ্রুত বিস্তার ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো নিজেদের আন্ডারওয়াটার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তবে প্রধান ক্ষমতাসীন দল ‘লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি’ বিষয়টিতে যথেষ্ট সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। দলের একাংশের মতে, জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেটের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন এবং কোনো ধরনের আবেগপ্রযুক্ত হয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমিও এর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক ঝুঁকির বিষয়টি বারবার স্মরণে এনে দিয়েছেন।
বর্তমানে জাপানের বহরে ২৩টি ডিজেল-ইলেকট্রিক অ্যাটাক সাবমেরিন রয়েছে, যা বিশ্বমানের এবং পানির নিচে অত্যন্ত নিঃশব্দে চলাচল করতে সক্ষম। যেখানে ২০২৬ সালে জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে রেকর্ড ৯ ট্রিলিয়ন ইয়েন, সেখানে ইতোমধ্যেই একাধিক নতুন টাইগেই-ক্লাস সাবমেরিন নির্মাণ, সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরক্ষার মতো প্রকল্পে বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে পারমাণবিক সাবমেরিন কর্মসূচির দিকে এগোলে চুল্লি প্রকৌশল, বিশেষায়িত রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র এবং পরমাণু পরিচালনায় অভিজ্ঞ কর্মী বাহিনীর জন্য বাড়তি অর্থ জোগাতে হবে। ফলে বিকল্প সামরিক সরঞ্জাম উন্নত করার বিপরীতে বিপুল খরচে পারমাণবিক সাবমেরিন কেনা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে বড় সংশয় থেকে যাচ্ছে।
প্রযুক্তি ও বাজেটের বাইরেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাপানের অভ্যন্তরীণ আইন ও দীর্ঘদিনের নীতি। দেশটিতে পরমাণু শক্তি আইনের অধীনে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে করার বিধান রয়েছে। যদিও পারমাণবিক সাবমেরিন ব্যবহারের মানে এই নয় যে জাপান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে, তবুও নীতিগত ও রাজনৈতিকভাবে তা এক স্পর্শকাতর পরিস্থিতির জন্ম দেয়। তদুপরি, জাপানের পরমাণু অস্ত্র সংক্রান্ত ঐতিহ্যবাহী তিনটি মূল নীতি অক্ষুণ্ণ রেখেই এই সাবমেরিনের আইনি ব্যাখ্যা নিশ্চিত করতে হবে, যা সহজ কাজ নয়।
২০২৬ সালের শেষের দিকে জাপানের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল সংক্রান্ত নতুন চূড়ান্ত নথিতে এই বিষয়ে মূল দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আপাতত পারমাণবিক সাবমেরিনের কার্যকারিতা, আইনি দিক এবং আর্থিক খরচ বিচার করতে একটি গভীর সমীক্ষা পরিচালনা করা হতে পারে। যদি সমীক্ষার পর জাপান এই প্রযুক্তি গ্রহণ নাও করে, তবে সেটিকে কৌশলগত পরাজয় বলা যাবে না; বরং এটি হবে দেশের আর্থিক ও সামরিক নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর পথ বেছে নেওয়ার একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রয়াস।
সূত্র: এশিয়া টাইমস
