বাসডুবির দুর্ঘটনায় ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক মা!
দেবাশীষ বিশ্বাস, রাজবাড়ী
‘ আমার একটা বাচ্চা, আমার সোনার ছেলে। সবাই ওদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? এত মানুষ কেন আমাদের বাড়িতে?’ এভাবেই কথা বলছিলেন ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা ডা. ইসরাত জাহান রুবা।
কিছুক্ষণ পর আবার বলছেন, ‘আমার মাকে হারিয়ে ফেললাম, আমার একমাত্র ভাইটা পদ্মায় ডুবে মারা গেলে। আমরা দুই বোন ডাক্তার। আমরা ওদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না।’
পরিবারের তিনজনকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আর্তনাদ করছিলেন ডা. ইসরাত জাহান ।
একই পরিবারের নিহতরা হলেন, রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর গ্রামের মৃত ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), রেহেনা আক্তারের ছোট ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান, রেহেনা আক্তারের নাতি ও ডা. ইশরাত জাহান রুবার ছেলে তাজবীর (৭)। নিহত আহনাফ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় রাজবাড়ীর পৌরসভার ভবানীপুর লাল মিয়া সড়কে নিহতের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের আহাজারি দেখা যায়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠছিল রাজবাড়ীর আকাশ-বাতাস।
তাজবীরের মা ডা. ইশরাত জাহান বলেন, আমি কেমন করে বাঁচবো তোকে ছাড়া। আগের দিন আমার সাথে তোকে ঢাকায় নিয়ে গেলে তুই বেঁচে থাকতি বাবা? আমার ছোট ভাইটাও চলে গেলো। আমার ছেলে বাসায় আসবে বলে আমি রান্না করেছিলাম। আমি কিছুই জানতাম না। সন্ধ্যায় গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফোন করে বলা হয় বাসডুবিতে আপনার মা মারা গেছেন। কিছুক্ষণ পর জানতে পারি আমার ভাই ও আমার আদরের সন্তানকে পাওয়া যাচ্ছে না। রাতে আমি আমার সন্তানের লাশ পেয়েছি।
সন্তান ও ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমি ঈদের ছুটি শেষ করে ঢাকা যাই। তখন আমার ছেলে বলেছিল মা, সাবধানে যেও। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমার বাবা তো নেই। তুমি কার কাছে ঘুমাবে। সে উত্তরে বলেছিল মামার কাছে ঘুমাবো। আজ মামার সাথে আলাদা খাটিয়াতে শুয়ে আছে। কত সুখ আর শান্তির সংসার এক সেকেন্ডে শেষ হয়ে গেলো। আমার সব ছিল কিন্তু আজ কিছু নাই!
নিহত শিশু তাজবীরের চাচা আতাউল গনি মুক্তাদির বলেন, আমার ভাতিজারা ঢাকায় মিরপুর থাকে। ওর বাবা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে সে সুদানে আছে। তাজবীর ইংলিশ মিডিয়ামে প্লে শ্রেণিতে পড়ে। আমার ভাতিজা ঈদের ছুটি শেষে রাজবাড়ীতে এসেছিল। ঈদ শেষ করে বুধবার বিকালে আমার ভাতিজা তার নানী, খালা ও মামার সাথে ঢাকায় ফিরছিল। তাদের বহনকারী বাসটি দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। এতে তাজবীবের খালা বেঁচে ফিরে এলেও বাকিরা মারা গেছে। আমরা আমাদের বংশের প্রদীপ হারিয়ে ফেলেছি।
জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহতের দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান জেলা প্রশাসক সুলতানা অক্তার।
