ভালোবাসা যত বড় হয়, জীবনটা তত নয়”: বিত্তবৈভব ছেড়ে ১৫ বছর ধরে কবর পরিষ্কারেই যার প্রশান্তি

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি ঃ
বার্ধক্যের ক্লান্ত শরীরে চলাফেরার ধীরগতি, অথচ মনের জোর আর ভালোবাসার গভীরতা যেন এক রূপকথার গল্প। বিত্তবৈভব, বহুতল সুপার মার্কেট, ফ্ল্যাট বাড়ি আর সফল কর্মজীবনের সবকিছু পেছনে ফেলে একজন মানুষ প্রতিদিন ভোরে হাতে তুলে নেন ঝাড়ু। উদ্দেশ্য একটাই প্রিয়তমা স্ত্রীর কবর এবং পুরো কবরস্থানটিকে পরিচ্ছন্ন রাখা।
দিনাজপুরের বিরামপুর জজ কোর্টের ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মওলা বক্সের এই অনন্য ভালোবাসা ও প্রাত্যহিক রুটিন আজ শুধু এক ব্যক্তির গল্প নয়, বরং এটি নিঃশর্ত প্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৯৭০ সালের উত্তাল দিনগুলোতে ভিন্নধর্মী এক তরুণীকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন মওলা বক্স। পরিবার ও সমাজের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সেই হিন্দু তরুণী নিজের ধর্ম ও পরিজন ছেড়ে তাঁর হাত ধরেছিলেন। একে অপরের গভীর বিশ্বাস ও অকৃত্রিম ভালোবাসার সুদৃঢ় বন্ধনে তারা গড়ে তুলেছিলেন এক সুশীতল সংসার।
তাদের কোল আলো করে আসে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সন্তানদের সবাই আজ উচ্চশিক্ষিত প্রত্যেকেই এলএলবি পাস করে স্বাবলম্বী। বিরামপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র ঢাকামোড়ে বিত্তশালী এই পরিবারের রয়েছে নিজস্ব বহুতল সুপার মার্কেট ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বাড়ি। সমাজের চোখে এক সফল ও পরিপূর্ণ জীবনের অধিকারী ছিলেন তারা।
কিন্তু সুখের দিনেও যতি টেনে দেয় নির্মম বাস্তবতা। ২০১১ সালে দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী জাহানারা বেগম ঝর্ণা মারা যান। স্ত্রীর মৃত্যুতে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েন মওলা বক্স। দীর্ঘ জীবনের সাথীকে হারানোর শূন্যতা তাকে গ্রাস করে ফেলে।
প্রিয়তমার স্মৃতির টানে ও তাঁর আত্মার মাগফিরাতের জন্য মওলা বক্স নিয়ম করে ফেলেছেন একটি নিত্যদিনের রুটিন। প্রতিদিন ফজর নামাজের আজান পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ছুটে যান স্ত্রীর কবরের পাশে। নিজ হাতে পরিষ্কার করেন স্ত্রীর পাকা কবরটি। ঝরে পড়া গাছের ডালপালা, শুকনো পাতা ও আগাছা পরিষ্কার করতে করতে একসময় পুরো কবরস্থানের দায়িত্ব যেন নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি।
গত ১৫ বছর ধরে এটিই তাঁর প্রতিদিনের সকালের শুরু। শুধু স্ত্রীর কবরই নয়, বরং পুরো কবরস্থানের চলাচলের রাস্তা ও চারপাশ নিজ হাতে ঝাঁটা দিয়ে পরিষ্কার করেন এই প্রবীণ আইনজীবী। সমাজের বিত্তশালী ও সম্মানিত একজন মানুষ হয়েও নিয়মিত এই কাজটি করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেন না তিনি। বরং এই কাজে ক্লান্তি তো দূরের কথা, তিনি খুঁজে পান এক অপার আত্মিক শান্তি ও প্রশান্তি।
একান্ত আলাপচারিতায় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে অ্যাডভোকেট মওলা বক্স বলেন, “আমার প্রয়াত স্ত্রী সব কিছু ছেড়ে এসে আমার সঙ্গে ঘর বেঁধেছিলেন। তাঁর সেই অকৃত্রিম ভালোবাসাকে স্মরণ করেই আমি প্রতিদিন কবরস্থানে যাই এবং নিজ হাতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করি।
ব্যক্তিগত জীবনের এই গভীর অনুরাগের পাশাপাশি কর্মজীবনেও মওলা বক্স রেখে চলেছেন উজ্জ্বল ভূমিকা। তিনি বিরামপুর জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সভাপতি। বিরামপুরের বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি সবসময় সরব ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন।
জীবনের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে, ৮৫ বছর বয়সের কোঠায় এসে মওলা বক্সের এই জীবনদর্শন আধুনিক যান্ত্রিক সমাজের বুকে এক পরম উপলব্ধির জন্ম দেয়। প্রবীণ এই আইনজীবীর কণ্ঠে ঝরে পড়ে এক শাশ্বত বাণী : তিনি বলেন
“ভালবাসা যত বড় হয়, জীবনটা তত নয়।”
স্থানীয়রা জানান, ভোরে যখন চারপাশের দোকানপাট বা পথঘাট সবেমাত্র খুলতে শুরু করে, ঠিক তখনই অ্যাডভোকেট মওলা বক্সকে হাতে ঝাড়ু নিয়ে কবরস্থানের ভেতর কাজ করতে দেখা যায়। কেউ কখনো তাঁকে এই কাজে ক্লান্ত বা বিরক্ত হতে দেখেননি। বরং তাঁর চেহারায় সবসময় থাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও সন্তুষ্টির ছাপ।
বিরামপুরের মানুষের কাছে অ্যাডভোকেট মওলা বক্স আজ কেবল একজন সফল আইনজীবী বা সমাজকর্মীই নন, তিনি হয়ে উঠেছেন ভালোবাসার এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights