যেই অবস্থানেই থাকি, মৃত্যু আমাদের নাগাল পাবেই

অনলাইন ডেস্ক

কোরআনুল কারিমের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ৭৮

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

اَیۡنَ مَا تَكُوۡنُوۡا یُدۡرِكۡكُّمُ الۡمَوۡتُ وَ لَوۡ كُنۡتُمۡ فِیۡ بُرُوۡجٍ مُّشَیَّدَۃٍ ؕ وَ اِنۡ تُصِبۡهُمۡ حَسَنَۃٌ یَّقُوۡلُوۡا هٰذِهٖ مِنۡ عِنۡدِ اللّٰهِ ۚ وَ اِنۡ تُصِبۡهُمۡ سَیِّئَۃٌ یَّقُوۡلُوۡا هٰذِهٖ مِنۡ عِنۡدِكَ ؕ قُلۡ كُلٌّ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰهِ ؕ فَمَالِ هٰۤؤُلَآءِ الۡقَوۡمِ لَا یَكَادُوۡنَ یَفۡقَهُوۡنَ حَدِیۡثًا ﴿۷۸﴾

সরল অনুবাদ

৭৮. তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমনকি সুউচ্চ সুদৃঢ় অবস্থান করলেও। যদি তাদের কোনো কল্যাণ হয় তবে তারা বলে, “এটা আল্লাহর কাছ থেকে।” আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয় তবে তারা বলে, “এটা আপনার কাছ থেকে। বলুন, সবকিছুই আল্লাহর কাছ থেকে। এ সম্প্রদায়ের কি হল যে, এরা একেবারেই কোনো কথা বুঝে না!”

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

সুরা আন-নিসার এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের এক গভীর আত্মপ্রবঞ্চনার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। মানুষ সাধারণত মৃত্যুকে দূরে ঠেলে দিতে চায়।আর দুর্গ, নিরাপত্তা, ক্ষমতা, প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তিকে নিজের ঢাল মনে করে। কিন্তু আল্লাহ ঘোষণা করছেন যে, মৃত্যু এমন এক বাস্তবতা, যা কোনো প্রাচীর, কোনো দুর্গ, কোনো সুউচ্চ অট্টালিকা বা আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ঠেকাতে পারে না। মানুষ যেখানেই থাকুক, যেকোনো অবস্থায় থাকুক; মৃত্যু তার নাগাল পাবেই।

আয়াতে ব্যবহৃত “বুরুজিন মুশাইয়্যাদা” (سُدُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ) শব্দগুচ্ছ কেবল প্রাচীন দুর্গ বা উঁচু টাওয়ার বোঝায় না; বরং এটি প্রতীকী অর্থে বোঝায়— ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক প্রাচুর্য, আধুনিক প্রযুক্তি ও চিকিৎসা ব্যবস্থা, সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাব ইত্যাদি। অর্থাৎ মানুষ যত শক্ত সুরক্ষার মধ্যেই নিজেকে রাখুক না কেন, আল্লাহ নির্ধারিত সময় এলে মৃত্যু অনিবার্যভাবেই পৌঁছে যাবে।

আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহ মানুষের আরেকটি মানসিক ব্যাধি তুলে ধরেছেন। যখন মানুষের জীবনে কল্যাণকর কিছু আসে। যেমন: স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, বিজয়, সাফল্য। তখন তারা অনায়াসেই বলে, “এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে।” কিন্তু যখন দুঃখ, পরাজয়, ক্ষতি বা বিপর্যয় আসে। তখন তারা দোষ চাপাতে চায় নবীর ওপর।

তবে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, এখানে কল্যাণ দ্বারা বদরের যুদ্ধে বিজয় ও গনীমত লাভ বোঝানো হয়েছে। পক্ষান্তরে অকল্যাণ দ্বারা ওহুদের যুদ্ধে যে বিপদ সংঘটিত হয়েছিল, যাতে রাসূলের চেহারা মুবারকে ক্ষত হয়ে গিয়েছিল এবং তার দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিল তা বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে তাবারী)।

এই দ্বৈত মানসিকতা মূলত তাকদীর সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা থেকে জন্ম নেয়। মানুষ আল্লাহকে কেবল সুবিধার সময় স্মরণ করে, কিন্তু পরীক্ষার সময় তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতাকে মানতে চায় না।

অথচ বাস্তবতা তো এই যে, “সবকিছুই আল্লাহর কাছ থেকে আসে” এটাই তাকদীরের সঠিক বোধ। আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন; কল্যাণ ও অকল্যাণ উভয়ই আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতিতেই ঘটে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ তার কাজের দায় থেকে মুক্ত। বরং ইসলাম শিক্ষা দেয়- কল্যাণ আল্লাহর অনুগ্রহ, অকল্যাণ অনেক সময় মানুষের নিজের কর্মের ফল বা পরীক্ষাস্বরূপ আসে। উভয় অবস্থাতেই বান্দার দায়িত্ব হলো- সবর, শোকর ও আত্মসমালোচনা। এটাই তাকদীরের ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিপূর্ণ আকীদা।

আয়াতের শেষ অংশে আক্ষেপ ফুটে ওঠে- এ জাতির কী হলো, এরা কথা বোঝে না! অর্থাৎ- মৃত্যু দেখেও শিক্ষা নেয় না, ইতিহাস দেখেও উপদেশ গ্রহণ করে না, কল্যাণে অহংকার করে, বিপদে ঈমান টলে যায়। এটি কেবল তৎকালীন কোনো জাতির জন্য নয়; বরং সকল যুগের মানুষের জন্য এক কঠোর আত্মসমালোচনার আয়না।

আজকের দুনিয়ায় যখন মানুষ নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও শক্তির শিখরে পৌঁছেও হঠাৎ মহামারি, যুদ্ধ, দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। এই আয়াত তখন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়- মানুষ যত শক্তই হোক, মৃত্যু আল্লাহর এক অনিবার্য সিদ্ধান্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights