রাগ সংবরণ : মুমিনের প্রকৃত শক্তির পরিচয়

শায়খ আহমাদুল্লাহ

মানুষের জীবনে এমন অনেক পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে মানুষের রাগ হয়। রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিরক্তিবোধ থেকে রাগের জন্ম হয়। আর জীবন চলার নানা বাঁকে তৈরি হয় বিরক্তির উপলক্ষ। কারও কোনো কথা, আচরণ কিংবা নির্দেশে মানুষ বিরক্ত হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া, অন্যের অবহেলা, অপমান কিংবা অনাকাক্সিক্ষত এমন অনেক ছোট ছোট বিবিধ ঘটনা থেকেও মানুষের মনে রাগের সঞ্চার হয়।

রাগ দোষণীয় কিছু নয়, কিন্তু রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা নিন্দনীয়। কারণ রাগের বশে মানুষ কখনো কখনো এমন কিছু বলে ফেলে বা করে বসে, যা মুহূর্তের উত্তেজনা কেটে যাওয়ার পর নিজের কাছেই খারাপ লাগে। অথচ তখন আর সেই কথাগুলো ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই রাগের মুহূর্তে মানুষ নিজের আচরণ কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার মধ্যেই প্রকাশ পায় তার ব্যক্তিত্বের পরিচয়।

এ ছাড়া রাগ নিয়ন্ত্রণ করা মুমিনের অন্যতম মহৎ গুণও। কোরআনে মহান আল্লাহ জান্নাতের অধিকারী মুত্তাকি ও সৎকর্মশীলদের অন্যতম প্রধান ভূষণ হিসেবে রাগ সংবরণের কথা ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা সচ্ছলতায় ও অভাবের সময়ে ব্যয় করে এবং যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন’ (সুরা আলে ইমরান-১৩৪)।

হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত বীর সে নয়, যে কুস্তিতে অপরকে পরাভূত করে, বরং প্রকৃত বীর সেই ব্যক্তি, যে রাগ বা ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে’ (সহিহ মুসলিম-২৬০৯)।

রাগ উঠলে মানুষের রক্তচাপ দ্রুত বাড়ে, মস্তিষ্ক উত্তপ্ত হয় এবং হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। নিয়ন্ত্রণহীন মানুষ তখন অনেকটা এমন এক রোগীর মতো আচরণ করে, যার ওপর তার নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে তার থেকে এমন অপ্রীতিকর কথা ও অসংলগ্ন আচরণ প্রকাশ পায়, যার জন্য পরবর্তীতে তাকে চরম লজ্জা ও অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হয়। লোকমুখে একটি প্রবাদ অত্যন্ত সত্য-‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন’। জীবনের বাস্তবতায় দেখা যায়, যারা তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় উন্মাদ হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখায়, জীবনে তারাই সবচেয়ে বেশি অসম্মানিত ও ছোট হয়। লাগামহীন রাগ মানুষের ব্যক্তিত্বের ভারসাম্য নষ্ট করে, তাই উত্তেজনার চরম মুহূর্তে নিজেকে স্থির রাখা আত্মজয়ের এক অনন্য বীরত্ব।

একবার এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘আমাকে উপদেশ দিন।’ রসুল (সা.) বললেন, ‘রাগ করো না।’ লোকটি একই কথা বারবার জিজ্ঞেস করলেন। প্রতিবারই তিনি একই উত্তর দিলেন, ‘রাগ করো না’ (সহিহ বুখারি-৬১১৬)।

রাগ প্রশমিত করার জন্য নবীজি (সা.) অত্যন্ত বাস্তবিক ও মনস্তাত্ত্বিক কিছু সমাধান বাতলে দিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন, যখনই কারও রাগ মাত্রাতিরিক্ত রূপ ধারণ করে, সে যেন পাঠ করে-‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’। কেননা ক্রোধ শয়তানের কুপ্ররোচনা থেকে সৃষ্টি হয়, আর মহান আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়া শয়তানের সেই চক্রান্তকে নিস্তেজ করে দেয়। এর পাশাপাশি নবীজি (সা.) নিজের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের নির্দেশনা দিয়েছেন। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় রাগ এলে বসে পড়া এবং বসা অবস্থায় রাগ থাকলে শুয়ে পড়া। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এটি স্নায়বিক উত্তেজনা কমানোর এক অনন্য কৌশল।

এ ছাড়া রসুল (সা.) অজু করার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ ক্রোধ বা রাগের জন্ম হয় আগুন থেকে, আর পানির শীতল স্পর্শ সেই আগুনকে নিভিয়ে দেয়। হাত-মুখে ঠান্ডা পানির ছোঁয়া উত্তপ্ত মস্তিষ্ককে শীতল করে। একই সঙ্গে রাগের সময় অহেতুক তর্ক না বাড়িয়ে পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করাও নবীর সুন্নাহর শিক্ষা।

ক্রোধ সংবরণের সুফল এবং এর বিপরীত পরিণতির কথা প্রতিটি মুহূর্তে স্মরণ রাখা প্রয়োজন। এক মুহূর্তের নিয়ন্ত্রণহীন রাগের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে বছরের পর বছর তিলে তিলে গড়া সাজানো সংসার, ছিন্ন হতে পারে রক্তের বন্ধন এবং ধূলিসাৎ হতে পারে সারা জীবনের লালিত সম্মান ও মর্যাদাও। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাগ বা ক্রোধ সংবরণ করে, হাদিসে তাকে কিয়ামতের ময়দানে গোটা সৃষ্টির সামনে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে (সুনানে তিরমিজি-২৪৯৩)।

সুতরাং জীবনে যত প্রতিকূল বা অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিই আসুক, ঠান্ডা মাথায় পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকাই হলো মুমিনের শক্তি। আর নিজের ভিতরের হিংস্র সত্তা দমিয়ে সব মুহূর্তে ক্ষমা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়ার মাধ্যমেই মুমিন দুনিয়া ও আখিরাতে আসল বিজয়ী হিসেবে পরিগণিত হয়।

♦ জুমার মিম্বর থেকে

গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights