রাজপথে খোলা চুলে নারীরা, হিজাব আইন প্রয়োগে দ্বিধায় তেহরান

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশটির সরকার। বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্য করে প্রকাশ্যে খোলা চুলে চলাফেরা করছেন ক্রমেই বেশি সংখ্যক নারী। এমন পরিস্থিতিতে কট্টরপন্থিরা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেও সরকার আপাতত বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

যুদ্ধের এই সময়েও সরকারপন্থি সমাবেশ এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে হিজাব ছাড়া নারীদের উপস্থিতি দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতেও তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় স্কার্ফ ছাড়া নারীদের চলাচলের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

এমনকি একটি ভিডিওতে জাতীয় পতাকা হাতে এক হিজাবহীন নারীকে বলতে শোনা যায়, তাঁর স্বামী সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং তিনি তাঁকে নিয়ে গর্বিত।

বর্তমানে ইরানের সরকারের বড় অগ্রাধিকার যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং মোজতবা খামেনির অধীনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্গঠন। এর মধ্যে নারীদের পোশাকসংক্রান্ত বিধিনিষেধ কঠোরভাবে প্রয়োগের বিষয়টি কিছুটা পেছনে পড়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে কট্টরপন্থিরা আবারও হিজাব আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি তুলছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিকেরা প্রকাশ্য নগ্নতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পোশাকের নিয়ম না মানায় ক্যাফে ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

তবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিপুলসংখ্যক নারীর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান চালানো এক বিষয় নয়। সরকারকে এখন সেই কঠিন সিদ্ধান্তই নিতে হচ্ছে।

মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর চার বছর পেরিয়ে গেলেও বাধ্যতামূলক হিজাব নিয়ে ইরানের নারীদের মধ্যে অসন্তোষ কমেনি। বরং অনেক নারী প্রকাশ্যেই এই আইন অমান্য করছেন। ফলে নতুন করে কঠোর অভিযান শুরু করলে আবারও বড় ধরনের বিক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হিজাব নিয়ে দীর্ঘ বিরোধ

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে নারীদের জন্য ইসলামি পোশাকের বিধান চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্র ও সরকারি স্থানে বাধ্যতামূলক হিজাব কার্যকর করা হয়। নির্ধারিত পোশাক না মেনে জনসমক্ষে আসা নারীরা আইনের আওতায় শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।

পরবর্তী সময়ে নারীদের পোশাকের নিয়ম বাস্তবায়নে নীতি পুলিশ বা গাইডেন্স প্যাট্রল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। হিজাব যথাযথভাবে না পরার অভিযোগে নারীদের থামানো ও আটক করা হতো।

২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তেহরানে হিজাব যথাযথভাবে না পরার অভিযোগে ২২ বছর বয়সী কুর্দি ইরানি নারী মাহসা আমিনিকে আটক করে নীতি পুলিশ। তিন দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর পুলিশি হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়।

ইরানি কর্তৃপক্ষ তাঁর মৃত্যুকে স্বাভাবিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও জাতিসংঘের তদন্তে বলা হয়, বেআইনি বল প্রয়োগের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

আমিনির মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নারী, জীবন, স্বাধীনতা আন্দোলন। বিক্ষোভের সময় বহু নারী মাথার স্কার্ফ খুলে ফেলেন, কেউ কেউ তা পুড়িয়ে দেন এবং চুল কেটে প্রতিবাদ জানান।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির এক প্রতিবেদনে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর অপ্রয়োজনীয় ও প্রাণঘাতী বল প্রয়োগে অন্তত ৬৮ শিশুসহ ৫৫০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হন। এ সময় হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়।

২০২৪ সালে হিজাব আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর শাস্তি ও নজরদারির বিধান রেখে একটি আইন অনুমোদন করা হলেও সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে সেটির বাস্তবায়ন স্থগিত করা হয়।

এবারও কঠোরতার দাবি

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের কট্টরপন্থিরা আবারও হিজাব আইন কার্যকরের দাবি তুলছেন। কট্টরপন্থি কায়হান পত্রিকার সম্পাদক হোসেইন শরীয়তমাদারি বলেছেন, হিজাব বিধি প্রয়োগ করা আইনি বাধ্যবাধকতা এবং ধর্মীয় দায়িত্ব।

ইরানের ইসফাহানে একটি সমাবেশে প্রদর্শিত একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, নেতানিয়াহু, হিজাবহীন নারীরা আমাদের জন্য বিনামূল্যের সৈনিক।

এদিকে মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন না মানায় ১৯ জুলাই তেহরানে অন্তত সাতটি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হয়। দক্ষিণ খোরসান প্রদেশেও সামাজিক আদর্শ ও বাধ্যতামূলক হিজাব বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ১০টি ক্যাফে বন্ধ করার খবর পাওয়া গেছে।

কিন্তু রাস্তায় চিত্র ভিন্ন

কর্তৃপক্ষের নানা পদক্ষেপের মধ্যেও ইরানের রাস্তায় হিজাব ছাড়া নারীদের উপস্থিতি কমেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, তরুণীরা স্কার্ফ ছাড়াই স্কুটার চালিয়ে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে চলাচল করছেন।

তেহরানের ষাটোর্ধ্ব এক নারী সিএনএনকে বলেছেন, কর্তৃপক্ষ এখনো নারীদের সরাসরি মুখোমুখি হতে দ্বিধায় রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, তেহরানের অনেক নারী এখন ক্রপ টপ, শর্টসসহ বিভিন্ন পোশাকে চলাফেরা করছেন এবং মাথার স্কার্ফ যেন অতীতের বিষয় হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, তিনি মনে করেন না সরকার আবার এসব তরুণীকে মাথায় স্কার্ফ পরাতে পারবে। তবে একই সঙ্গে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময়কার অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করেন তিনি। তখনও অনেকে মনে করেছিলেন, নারীদের হিজাব পরতে বাধ্য করা সম্ভব হবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করা হয়েছিল।

পেজেশকিয়ানের ভিন্ন অবস্থান

বাধ্যতামূলকভাবে মানুষের আচরণ পরিবর্তন করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও। নিজের মেয়ের সঙ্গে মতবিরোধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেছেন, এর অর্থ কি তাঁকে জোর করে পরিবর্তন করতে হবে।

পেজেশকিয়ানের ভাষ্য, আচরণের পরিবর্তন একটি সাংস্কৃতিক বিষয় এবং এটি বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। শক্তি প্রয়োগ করে মানুষের মনে বিশ্বাস তৈরি করা যায় না।

ইরানের সাবেক সংসদ সদস্য গোলামআলী জাফরজাদেহ ইমানাবাদীও কর্মকর্তাদের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

যুদ্ধের মধ্যে নতুন ঝুঁকি

ইরান এখন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের অর্থনৈতিক চাপ সামলাচ্ছে, অন্যদিকে এই যুদ্ধকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরছে। এমন পরিস্থিতিতে নারীদের পোশাক নিয়ে নতুন করে কঠোর অভিযান শুরু করা সরকারের জন্য আরেকটি বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

কারণ ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল। আন্দোলন দমন করা হলেও বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে নারীদের অবস্থান পুরোপুরি থামেনি।

ইরানের ইসলামিক প্যানাল কোডের ৬৩৮ অনুচ্ছেদে ইসলামি হিজাব ছাড়া নারীদের জনসমক্ষে আসাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ২০২৪ সালে অনুমোদিত কঠোর আইনে জরিমানা ও নজরদারি বাড়ানোর বিধান রাখা হলেও সেটির বাস্তবায়ন স্থগিত রয়েছে।

ফলে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যে ইরান সরকারকে এখন হিজাব আইন নিয়ে নতুন করে হিসাব করতে হচ্ছে। একদিকে কট্টরপন্থিদের চাপ, অন্যদিকে নারীদের মধ্যে প্রকাশ্য আইন অমান্যের প্রবণতা। এর মধ্যে আবার কঠোর অভিযান চালালে মাহসা আমিনির পরের পরিস্থিতির মতো নতুন কোনো সংঘাত তৈরি হবে কি না, সেটিও ভাবতে হচ্ছে তেহরানকে।

সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights