শতবর্ষী বটতলায় লোকগানের সুরে ফিরল বাংলার হারানো ঐতিহ্য
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
গ্রামীণ সড়ক ঘেঁষে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। মাঠের এক কোণে প্রায় ৩৩ শতাংশ জমিজুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল এক বটগাছ। চারদিকে অন্তত ১৪টি ছোট-বড় বটগাছ মূল গাছটিকে ঘিরে রেখেছে। সবুজ-শ্যামল ও ছায়াঘেরা বটগাছের নিচে বিছানো হয়েছে বিভিন্ন রঙের ত্রিপল, পাটি ও কাপড়। সেখানে বসে ও দাঁড়িয়ে রয়েছেন বিভিন্ন বয়সী কয়েক শ মানুষ। কেউ গাইছেন গান, কেউবা মুগ্ধ হয়ে শুনছেন।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার বেতবাড়ীয়া ইউনিয়নের একতারপুর গ্রামে শনিবার বিকেলে দেখা যায় এমন দৃশ্য। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা বাংলার প্রাণের লোকসংগীতকে বাঁচিয়ে রাখা এবং হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে বসেছিল প্রাণবন্ত এই লোকগানের আসর।
পেশায় কাঠমিস্ত্রি এবং খোকসা কমিউনিটি লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা জসিম উদ্দিনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়। এতে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি ও লালনগীতির সুরে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
স্থানীয়রা বলছেন, লোকগানের আসর কেবল গান শোনার অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি মিলনমেলা। তাঁদের ভাষ্য, বটগাছটির বয়স আনুমানিক ১০০ বছরের বেশি। এ আয়োজনে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন শিল্পী ও দর্শনার্থীরা।
এ সময় একতারপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রামদাস পাল বলেন, বটগাছটির বয়স ১০০ বছরের বেশি। প্রথমবারের মতো এমন আয়োজনে সবাই খুশি। ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে পাড়া-মহল্লায় জারি, সারি ও লোকগানের আসর বসত।
ঈশ্বরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুস্মিতা পাল বলে, জীবনে প্রথমবার লোকগান শুনছে সে। সবুজ প্রকৃতি ও খোলামেলা পরিবেশে মায়ের সঙ্গে এসে তার খুবই ভালো লাগছে।
আয়োজনে স্থানীয় ও আমন্ত্রিত দেড় শতাধিক বাউলশিল্পী দোতারা, একতারা, ঢোল ও বাঁশির তালে তালে লোকগান পরিবেশন করেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে ভাবের আদান-প্রদানের পাশাপাশি শিল্পীরা গানের অর্থ, পেছনের ইতিহাস ও দর্শন ব্যাখ্যা করেন। এসব গানের শ্রোতা ছিলেন বিভিন্ন বয়সী ও ধর্মের মানুষ। স্থানীয়রা জানান, প্রথমবারের মতো এমন আয়োজনে অংশ নিতে পেরে তাঁরা আনন্দিত।
লোকগানের আসরে ছুটে আসেন বাংলাদেশ প্রবীণ-তারুণ্য সংগঠনের সভাপতি শাহিদা ইসলাম। তিনি বলেন, গানে গানে জাত-পাত ও ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে, যা তরুণ প্রজন্মকে মানবিক হতে শেখায়। চমৎকার আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
আধুনিক গানের ভিড়ে যেখানে নিজস্ব সুর ও বাদ্যযন্ত্র হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। অনুষ্ঠানে শ্রোতা ও শিল্পী রাণী বলেন, ‘ইউটিউব, ফেসবুকের যুগে এমন আসর মনে করিয়ে দেয়, এই গানে মাটির গন্ধ আছে, আছে প্রাণের শান্তি।’
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কুষ্টিয়া আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আইনজীবী খন্দকার সিরাজুল ইসলাম বলেন, লোকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। আমাদের সমাজের উন্নয়ন, বিবেক জাগ্রত করা, চিন্তার প্রসার এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে লোকগানের আসর বেশি বেশি আয়োজন করা প্রয়োজন।
আয়োজক ও খোকসা কমিউনিটি লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা জসিম উদ্দিন বলেন, হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা, তরুণ সমাজকে মাদক ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখা এবং সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশের লক্ষ্যেই এ লোকগানের আসরের আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এমন আয়োজন করা হবে।
আয়োজনে দেড় শতাধিক শিল্পী অংশ নেন।
