শহীদ জেহাদ: গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম

অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এদিন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজধানীর দৈনিক বাংলা মোড়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ছাত্রদল নেতা কে. এম. নাজির উদ্দিন জেহাদ। তাঁর আত্মত্যাগ নব্বইয়ের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে নতুন গতি সঞ্চার করে। একজন তরুণ ছাত্রনেতার মৃত্যু কীভাবে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রেরণা জুগিয়েছিল এবং বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে উঠেছিল, জেহাদের জীবন ও আত্মত্যাগ তার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

জেহাদকে স্মরণ করা মানে কেবল একটি মৃত্যুবার্ষিকী পালন নয়; বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে ছাত্রসমাজের ভূমিকা, রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা এবং আত্মত্যাগের ইতিহাসকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা।

উল্লাপাড়া থেকে রাজপথের সংগ্রামে

১৯৬৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার নবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কে. এম. নাজির উদ্দিন জেহাদ। তিনি সরকারি আকবর আলী কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় পর্যায়ে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় এই তরুণ ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে ঢাকায় আসেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে উল্লাপাড়া থেকে আরও প্রায় ৬০ জন ছাত্র এসেছিলেন।

এ ঘটনা তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকার পরিচয় বহন করে। রাজধানীর রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় আন্দোলনের অংশ হয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে তাঁর আত্মত্যাগ তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

১০ অক্টোবর ১৯৯০: আন্দোলনের রক্তাক্ত অধ্যায়

এরশাদবিরোধী আন্দোলন ১৯৯০ সালের অক্টোবর নাগাদ তীব্র হয়ে ওঠে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট এবং বামপন্থী পাঁচদলীয় জোট নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরকারের পদত্যাগ ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছিল। ছাত্রসমাজ, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে ক্রমেই বিস্তৃত করছিল।

১০ অক্টোবর রাজধানীতে বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলোর কর্মসূচি চলাকালে পল্টন ও দৈনিক বাংলা মোড় এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ ঘটে। সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে শহীদ হন জেহাদ। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছাত্রসমাজের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। গণতন্ত্রের দাবিতে রাজপথে নামা একজন তরুণের প্রাণহানি আন্দোলনের মানবিক মূল্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

তবে ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠের জন্য মনে রাখা জরুরি, এরশাদবিরোধী আন্দোলন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামের ফল। ১০ অক্টোবরের ঘটনা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হলেও স্বৈরশাসনের পতন ঘটেছিল পরবর্তী সময়ে বহু রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

জেহাদের আত্মত্যাগ ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য

শহীদ জেহাদের আত্মত্যাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো, তাঁর মৃত্যুর পর ছাত্রসংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের উদ্যোগ আরও জোরদার হয়। ঐতিহাসিক সংবাদবিবরণ অনুযায়ী, তাঁর মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের অংশগ্রহণে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ রূপ নেয়।

বিভিন্ন মতাদর্শ ও সাংগঠনিক পরিচয়ের ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা ছিল সে সময়ের আন্দোলনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। জেহাদের মৃত্যু সেই ঐক্যের শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়। তাঁর আত্মত্যাগ ছাত্রসমাজের মধ্যে সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তোলে।

তবে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠনের পেছনে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক উদ্যোগ ও রাজনৈতিক আলোচনা ছিল। তাই জেহাদের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার অর্থ হলো, তাঁর আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করার পাশাপাশি অন্য ছাত্রসংগঠন ও আন্দোলনকারীদের সম্মিলিত ভূমিকাকেও স্বীকৃতি দেওয়া।

নব্বইয়ের আন্দোলনের এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, বৃহত্তর গণতান্ত্রিক লক্ষ্য সামনে থাকলে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত পার্থক্য অতিক্রম করে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব।

গণ-অভ্যুত্থান ও এরশাদের পতন

১০ অক্টোবরের পর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। ২৭ নভেম্বর চিকিৎসক ডা. শামসুল আলম খান মিলন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলে ছাত্রসমাজ ও পেশাজীবীদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের কর্মসূচি, ছাত্র ঐক্যের আন্দোলন এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সরকারবিরোধী সংগ্রামকে আরও জোরদার করে।

অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর প্রায় নয় বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়।

এই পরিণতি কোনো একক ব্যক্তি বা সংগঠনের প্রচেষ্টার ফল ছিল না। রাজনৈতিক জোটগুলোর আন্দোলন, ছাত্রসমাজের ঐক্য, পেশাজীবীদের প্রতিবাদ এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম সম্মিলিতভাবে এরশাদ সরকারের পতনের পথ তৈরি করেছিল। সেই ইতিহাসে শহীদ জেহাদের আত্মত্যাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

স্মৃতির সঙ্গে থাকুক ইতিহাসের দায়

প্রতিবছর ১০ অক্টোবর শহীদ জেহাদ দিবস পালিত হয়। তাঁর স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করা হয়। কিন্তু একজন শহীদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কেবল বার্ষিক স্মরণানুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাঁর জীবন, রাজনৈতিক ভূমিকা, আত্মত্যাগ এবং সমসাময়িক আন্দোলনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তথ্যনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

জেহাদ ছিলেন ছাত্রদলের নেতা। তাঁর এই রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তাঁর আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক তাৎপর্য একটি সংগঠনের গণ্ডি অতিক্রম করে জাতীয় ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।

গণতন্ত্রের অর্থ শুধু নির্বাচন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন এবং ক্ষমতার জবাবদিহি। নব্বইয়ের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র রক্ষা ও বিকাশের জন্য রাজনৈতিক সহনশীলতা, জনগণের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা অপরিহার্য।

শহীদ জেহাদের সহযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার, পারিবারিক স্মৃতিচারণ, সমসাময়িক সংবাদপত্র ও ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণের মাধ্যমে তাঁর অবদান আরও প্রামাণ্যভাবে তুলে ধরা সম্ভব। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু একজন শহীদের জীবন সম্পর্কেই জানবে না; বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিস্তৃত ইতিহাসও আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবে।

উপসংহার

১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর শহীদ কে. এম. নাজির উদ্দিন জেহাদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায়। তাঁর মৃত্যু ছাত্রসমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।

শহীদ জেহাদকে যথাযথভাবে স্মরণ করার অর্থ হলো, তাঁর আত্মত্যাগকে জাতীয় ইতিহাসে মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করা এবং গণতন্ত্রের জন্য জীবন দেওয়া সব মানুষের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া। ইতিহাসের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় তথ্যনিষ্ঠ মূল্যায়ন, আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে।

জেহাদের আত্মত্যাগ তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি গণতন্ত্রের মূল্য, রাজনৈতিক ঐক্যের গুরুত্ব এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতারও স্মারক।

লেখক: কৃষিবিদ শাহাদাত হোসেন পারভেজ, সাবেক ছাত্রনেতা, কলামিস্ট ও টেকসই কৃষি উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights