সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নে কমছে অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
উন্নত সড়ক যোগাযোগ ও তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ আকাশপথে যাত্রী কমছে। দুই বছর ধরে যশোর, বরিশাল, রাজশাহীর শাহ মখদুম ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ধারাবাহিকভাবে যাত্রীসংখ্যা কমেছে। এর মধ্যে যশোরে পতন সবচেয়ে বেশি। বিপরীতে ঢাকার হযরত শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহ আমানত, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক ও কক্সবাজার বিমানবন্দরে আগের পতন কাটিয়ে গত অর্থবছরে যাত্রী চলাচলে পুনরুদ্ধার হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে যশোর বিমানবন্দর দিয়ে ২ লাখ ২১ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেছিলেন। দুই বছর পর এ সংখ্যা নেমে আসে ৯২ হাজার ২০০-এর কিছু বেশি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে যাত্রী নেমে এসেছে ৪৪ হাজারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
বরিশাল বিমানবন্দরেও পরিস্থিতি আরও নাজুক। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এখানে যাত্রী অভ্যন্তরীণ বিমানছিল ৫৮ হাজার। দুই বছর পর তা অর্ধেকের নিচে নেমে যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে যাত্রীসংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৫ শতাংশ কমে মাত্র ৮ হাজার ৭০০-তে দাঁড়িয়েছে।
যশোর ও বরিশালে যাত্রী কমার পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে পদ্মা সেতুর প্রভাব। ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সড়ক যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। কম সময়ে ও তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক যাত্রী আকাশপথ ছেড়ে সড়কপথ বেছে নিচ্ছেন।
রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরেও যাত্রী কমেছে। দুই বছর আগে বছরে এখানে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি যাত্রী যাতায়াত করতেন। গত অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ৮২ হাজার ২০০-তে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম।
উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর সৈয়দপুরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ৩ লাখের বেশি যাত্রী এ বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম।
বেসরকারি বিমান সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ আকাশপথে যাত্রী কমার অন্যতম কারণ তুলনামূলক বেশি বিমান ভাড়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন গন্তব্যে উন্নত সড়ক যোগাযোগ। ফলে যেসব রুটে সড়কপথে দ্রুত ও কম খরচে যাওয়া যায়, সেসব রুটে বিমানের চাহিদা কমছে।
তাদের মতে, কয়েকটি অভ্যন্তরীণ রুট এখন প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বরিশাল রুট প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। যশোরেও ফ্লাইট সংখ্যা কমে এসেছে এক বা দুটিতে। একসময় যশোর রুটে উড়োজাহাজের আসন ব্যবহারের হার প্রায় ১০০ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১০ শতাংশে।
বিমান সংস্থার সংশ্লিষ্টরা জানান, যশোর ও বরিশাল রুটে যাত্রী কমে যাওয়ার প্রভাব সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলেও পড়ছে। যাত্রী না থাকায় ফ্লাইট পরিচালনা কমাতে হচ্ছে। এতে একদিকে বিমান সংস্থাগুলোর ব্যবসায়িক সক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে কমছে যাত্রীদের বিকল্প পরিবহন সুবিধা।
বেবিচকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে ১ কোটি ৫৮ লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছেন। এর মধ্যে তিন-চতুর্থাংশের বেশি যাত্রী ব্যবহার করেছেন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করা মোট যাত্রীর প্রায় ৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দর।
ফলে দেশের মোট বিমানযাত্রীর বড় অংশ আন্তর্জাতিক ও প্রধান অভ্যন্তরীণ রুটে কেন্দ্রীভূত হলেও আঞ্চলিক কয়েকটি বিমানবন্দর ক্রমেই যাত্রী সংকটে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব রুট সচল রাখতে বিমান ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, সময়সূচি পুনর্বিন্যাস এবং যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী ফ্লাইট পরিচালনার উদ্যোগ প্রয়োজন।
